দর্শন
দর্শনের সংজ্ঞা : দর্শনের ইংরেজী প্রতিশব্দ Philosophy । গ্রীক শব্দ Philos হইতে ফিলসফির উৎপত্তি। Philos অর্থ lover of, fond of, etc. যাহাকে অনুরাগ বলা যায় । আর Sophia অর্থ হইল জ্ঞান । তাই ফিলসফির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ দাঁড়ায় জ্ঞানের প্রতি অনুরাগ। ফিলসফির সাধারণ অর্থ জ্ঞানের অন্বেষণ। ইহা দ্বারা বিশ্ব জগতকে চেনা ও বুঝা যায় এবং ধারণা করা যায়। আবার দর্শনের বাংলা দেখা। কিন্তু আমরা যাহা দেখি তাহা সর্বদা সত্য হয় না । সুতরাং এই দেখার সাথে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সংযোগ ছাড়া প্রকৃত সত্য পাওয়া সম্ভব নয়। তাই দর্শন মানে জ্ঞানচক্ষু দ্বারা দেখা ।
দর্শন হলো মানব চিন্তার একটি বিশেষ বিষয়বস্তু যা জ্ঞান, নীতি, মূল্যবোধ, বিশ্বাস, সৃষ্টিকর্তা এবং তাহার অস্তিত্ব, বিশ্বজগৎ সম্পর্কে ধারণা, জগৎ ও জীবন সম্পর্কে ধারণা, প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে যুক্তি ও প্রমাণ, মানবতার প্রতি স্বাভাবিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় এবং লৌকিক ও পারলৌকিক সম্পর্কে বিশ্বাস স্থাপন, স্রষ্টা ও সৃষ্টি,মানবিক সংস্কৃতির সম্পর্কে যুক্তি, চিন্তা ও জ্ঞান প্রভৃতি সম্পর্কে আলোচনা করে তাহাকে দর্শন বা ফিলসফি বলে।
দর্শন মানবকে জীবনের প্রশ্ন ও উত্তর খুঁজতে উৎসাহিত করে এবং তার জীবনের প্রতিটি দিকে নতুন ভাবনা ও নতুন দিক দেয়। এটি মানবকে তার আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতার অনুভূতি দেয় এবং তাকে আত্মসাত্বিক এবং আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা দেয়। দর্শন মানবকে জীবনের উদ্দেশ্য ও মানবিক সম্পর্কে চিন্তা করতে উৎসাহিত করে এবং মানবকে মূল্যবোধ এবং নীতিমূলক পরিকল্পনা করতে উৎসাহিত করে।
কোঁতে, পলসন, স্পেনসার প্রমুখ দার্শনিকের মতে “বিজ্ঞান জগতের বিভিন্ন বিভাগের যে জ্ঞান, তা সংগ্রহ করে সমন্বয় সাধন করাই হচ্ছে দর্শনের আসল উদ্দেশ্য ।”
দার্শনিক আলেকজান্ডারের মতে, “প্রাকৃতিক বিজ্ঞান খন্ড খন্ড বিজ্ঞান এবং দর্শন অখন্ড বিজ্ঞান”
ক্যান্টের মতে দর্শন হল, “বিজ্ঞানসম্মত জ্ঞান ও জ্ঞানের আলোচনা” ।
কমটির মতে, “দর্শন হল সকল বিজ্ঞানের বিজ্ঞান” ।
Plato এর মতে- অন্তরের জ্ঞান লাভ করা ও বস্তুর বিশেষ প্রকৃতি অবগত হওয়াকে দর্শন বলে । (Philosophy aims at a knowledge of the internal of essential nature of things.)
Socrates এর মতে- জ্ঞানানুরাগ ও জ্ঞানানুসন্ধানের নামই দর্শন। (Philosophy is the love of wisdom of persuit of knowledge.)
-Kant এর মতে- দর্শন হইল বিজ্ঞান সম্মত জ্ঞান ও জ্ঞানের সমালোচনা । (Philosophy is the science and criticism of Cognition.)
সুতরাং সবদিক বিবেচনা করে আমরা বলতে পারি, “জীবন ও জগতের সাথে জড়িত বিভিন্ন সমস্যার যুক্তিপূর্ণ ব্যখ্যা ও সমালোচনাকে দর্শন বলে ।
দর্শনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ :
1. বাস্তবতার প্রকৃতি বোঝা: দর্শনের কেন্দ্রীয় লক্ষ্যগুলির মধ্যে একটি হল বাস্তবতার মৌলিক প্রকৃতি বোঝা। দার্শনিকরা অস্তিত্বের প্রকৃতি, ভৌত এবং আধিভৌতিক জগতের গঠন এবং সমস্ত বাস্তবতার অন্তর্গত মৌলিক নীতিগুলি সম্পর্কে প্রশ্নগুলি অন্বেষণ করেন। দর্শনের এই শাখাটিকে প্রায়ই অধিবিদ্যা হিসাবে উল্লেখ করা হয়।
2. জ্ঞান এবং জ্ঞানবিজ্ঞানের অন্বেষণ: জ্ঞানতত্ত্ব হল দর্শনের একটি শাখা যা জ্ঞান, বিশ্বাস, ন্যায্যতা এবং সত্যের প্রকৃতি সম্পর্কে প্রশ্ন নিয়ে কাজ করে। দার্শনিকরা বুঝতে চান কিভাবে আমরা জ্ঞান অর্জন করি, কোনটি একটি ন্যায়সঙ্গত বিশ্বাস গঠন করে এবং কিভাবে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করা যায়।
3. নৈতিক অনুসন্ধান: নীতিশাস্ত্র দর্শনের একটি প্রধান ক্ষেত্র যা নৈতিকভাবে সঠিক এবং ভুল এবং আমাদের জীবন কীভাবে যাপন করা উচিত সে সম্পর্কে প্রশ্নগুলির উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। দার্শনিকদের লক্ষ্য মানুষের আচরণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য নৈতিক তত্ত্ব এবং নীতিগুলি বিকাশ করা।
4. নন্দনতত্ত্ব: নন্দনতত্ত্ব হল শিল্প, সৌন্দর্য এবং নান্দনিক অভিজ্ঞতার প্রকৃতির অধ্যয়ন। এই ক্ষেত্রের দার্শনিকরা সৌন্দর্যের প্রকৃতি, শিল্পের মূল্যায়নের মানদণ্ড এবং মানব জীবনে শিল্পের ভূমিকা সম্পর্কে প্রশ্নগুলি অন্বেষণ করেন।
5. যুক্তি এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা: দর্শন সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং তর্কের দক্ষতা বিকাশের উপর একটি শক্তিশালী জোর দেয়। যুক্তিবিদ্যা, দর্শনের একটি উপক্ষেত্র, বৈধ যুক্তি এবং যুক্তি নির্মাণের নীতিগুলি অন্বেষণ করে।
6. মনের দর্শন: দর্শনের এই শাখাটি চেতনার প্রকৃতি, মানসিক অবস্থা এবং মন ও দেহের মধ্যে সম্পর্ক সম্পর্কে প্রশ্ন করে। এটি মানুষের চিন্তা ও চেতনার প্রকৃতি বুঝতে চায়।
7. সামাজিক ও রাজনৈতিক দর্শন: সামাজিক ও রাজনৈতিক দর্শন ন্যায়বিচার, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, অধিকার এবং সমাজের আদর্শ কাঠামো সম্পর্কিত প্রশ্নগুলিকে সম্বোধন করে। এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার মূল্যায়ন ও উন্নতির জন্য একটি কাঠামো প্রদানের লক্ষ্য রাখে।
8. বিজ্ঞানের দর্শন: বিজ্ঞানের দার্শনিকরা বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের প্রকৃতি, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এবং নির্দিষ্ট বিজ্ঞানের দর্শন পরীক্ষা করেন। তাদের লক্ষ্য বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের প্রকৃতি এবং বিশ্ব সম্পর্কে আমাদের বোঝার সাথে এর সম্পর্ক স্পষ্ট করা।
9. অস্তিত্বগত এবং ঘটনা সংক্রান্ত অনুসন্ধান: দর্শনের কিছু শাখা, যেমন অস্তিত্ববাদ এবং ঘটনাবিদ্যা, বিষয়ভিত্তিক মানব অভিজ্ঞতা, স্বতন্ত্র সত্যতা এবং জীবনের অর্থ ও উদ্দেশ্য অনুসন্ধানের উপর ফোকাস করে।
10. জীবনের পথ হিসেবে দার্শনিক অনুসন্ধান: কিছু দার্শনিক ঐতিহ্য জীবনধারা হিসেবে দর্শনের অনুশীলনের ওপর জোর দেয়। এর সাথে শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধানই জড়িত নয় বরং একজনের দার্শনিক নীতি অনুসারে জীবনযাপন করার প্রতিশ্রুতিও জড়িত।
11. বিশ্ব জগতের সৃষ্টি:
12. অধ্যাত্মিক, ইহলৌকিক, পারলৌকিক, সৃষ্টিকর্তা ও তাহার অস্তিত্ব, তাহার সান্নিধ্য লাভ, তাহাকে বুঝা ও চেনার উপায়, আত্মা সম্বন্ধে ধারণা লাভ
দর্শনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হল মৌলিক প্রশ্ন এবং ধারণাগুলি সম্পর্কে আমাদের বোঝার গভীরতা যা মানুষের অস্তিত্বকে গঠন করে এবং জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জটিল সমস্যাগুলি সমাধানের জন্য অন্তর্দৃষ্টি এবং নির্দেশিকা প্রদান করা। এটি সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, মুক্তমনা এবং বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি এবং ধারণাগুলির অন্বেষণকে উত্সাহিত করে, যা বৌদ্ধিক ও নৈতিক বিকাশে অবদান রাখে। দর্শনের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এবং ফোকাস পৃথক দার্শনিক এবং দার্শনিক ঐতিহ্যের মধ্যে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হতে পারে।
“জ্ঞানানুরাগ ও জ্ঞানানুসন্ধ্যানের নামই দর্শন”:
দর্শন বা Philosophy শব্দটি গ্রীক শব্দ Philos এবং Sophia হইতে আসিয়াছে। Philos এর বাংলা প্রতিশব্দ অনুরাগ এবং Sophia শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ জ্ঞান। সুতরাং দর্শনের বাংলা জ্ঞানানুরাগ । জ্ঞানের প্রতি অনুরাগ এই সাদামাটা সংজ্ঞা দ্বারা দর্শনের প্রকৃত অর্থ বুঝা যায় না। কোঁতে, পলসন, স্পেনসার প্রমুখ দার্শনিকদের মতে, বিজ্ঞান সমস্ত জগতের বিভিন্ন বিভাগের যে জ্ঞান আহরণ করে তার সমন্বয় সাধন করাই হচ্ছে দর্শনের আসল উদ্দেশ্যে ।
জ্ঞানানুসন্ধ্যানের দ্বারা বিশ্ব জগতকে চেনা, বুঝা এবং ধারণা করা যায়। আবার দর্শনের বাংলা দেখা। দার্শনিকের দেখা ও সাধারণ লোকের দেখা এক কথা নয় । দার্শনিকের দেখা অতিন্দ্রীয়, অন্তদর্শন ও বিচার সম্মত গভীর দর্শন । সাধারণ লোক অন্ধকার রাতে এক খন্ড দড়ি দেখে সাপ দেখতেছে বলে মনে করে। কিন্তু একজন দার্শনিক তখন প্রশ্ন করবে যদি সাপ হয় তাহলে মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যাবে অথবা আক্রমণ করবে, ফনা তোলে শব্দ করে ভয় দেখাবে ।
এইভাবেই একজন দার্শনিক সত্যমিথ্যা যাচাই করার জন্য বিজ্ঞান ভিত্তিক বিচার, বিশ্লেষণ, সমালোচনা করে জ্ঞান অনুসন্ধ্যান করে
দর্শনের কাজ কি: জীবন ও জগতের সাথে জড়িত বিভিন্ন সমস্যার যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা ও সমালোচনাই হইল দর্শন। দর্শনের কাজকে প্রধানতঃ তিন ভাগে ভাগ করা যায় । যথা-
i) কাজের মূল্যায়ন।
ii) সমালোচনামূলক কাজ।
iii) গঠনমূলক কাজ।
i) কাজের মূল্যায়ন : এই বিশাল রহস্যে ঘেরা বিচিত্র বিশ্বজগতের দিকে মানুষ তাকাইতেছে আর অবাক হইতেছে। সেজন্য মানুষের চিন্তা চেতনার শেষ নাই। যুগে যুগে মানুষ চেষ্টা করিয়াছে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করিতে। মানুষ নিজের জীবনের দিকে ফিরিয়া তাকাইয়াও বিস্মিত হইয়াছে। তাই জীবন সম্পর্কে, আত্মা সম্পর্কে জানার ইচ্ছাও প্রকাশ করিয়াছে। তাই জীবনের উৎস, তাৎপর্য, স্বরূপ, পরিণতি প্রভৃতির যথাযথ ব্যাখ্যা ও মূল্যায়ন করা দর্শনের কাজ।
ii) সমালোচনামূলক কাজ : দর্শনের অন্যতম কাজ হইতেছে পরম আদর্শের স্বরূপ নির্ণয় এবং তাহার প্রেক্ষিতে জীবনের মূল্যায়ন। দর্শন অন্ধভাবে কোন কিছুকে গ্রহণ না করিলেও বুদ্ধিগ্রাহ্য কোনকিছুকেও বাদ দেয় না। দর্শনের কাজ হইল আমাদের অন্ধযুক্তিহীন জগৎ ও জীবনের ধারণাগুলিকে বিশ্লেষণ করিয়া জগতের সুসংবদ্ধ ও সুসংহত জ্ঞান প্রদান করা। দর্শন বিচার বিবেচনা ছাড়া কোন স্বীকার্য সত্যগুলোকেও গ্রহণ করে না। তাই সাধারণ লোক ও বিজ্ঞানীদের ধারণার সত্যাসত্য নিরূপণ করা দর্শনের কাজ।
iii) গঠনমূলক কাজ ঃ জগৎ ও জীবন সম্পর্কে ধারণা আমরা দর্শন হইতে পাই । দর্শন খণ্ড খণ্ড সত্যকে অখণ্ডতার সূত্রে গ্রথিত করিয়া পূর্ণ সত্যের ভাণ্ডারটি আমাদের সামনে তুলিয়া ধরে। তাই দর্শনের কাজ হইতেছে খণ্ড খণ্ড সত্যকে বাঁধিয়া একখণ্ড সত্যের ধারণা দেওয়া।
দর্শনের বিষয়বস্তু আলোচনা: দর্শনের বিষয়বস্তু অত্যন্ত ব্যাপক। দর্শন বিশ্ব প্রকৃতির কোন বিশেষ দিকের আলোচনা করে না। দর্শনের বিষয়বস্তুকে মোটামোটিভাবে চার ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
i) জ্ঞান বিদ্যা।
ii) তত্ত্ববিদ্যা ।
iii) রূপ বিদ্যা ।
iv) আদর্শ বিদ্যা ।
i) জ্ঞান বিদ্যা ঃ দর্শনের যে শাখায় জ্ঞানের উৎপত্তি, স্বরূপ, বৈধতা, সীমা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে আলোচনা করা হয় তাহাকে জ্ঞান বিদ্যা বলে । জ্ঞান বিদ্যা দ্বারা বিশ্বজগৎকে চেনা ও বুঝা যায় এবং ধারণা করা যায়।
ii) তত্ত্ববিদ্যা ঃ দর্শনের যে শাখায় পরম সত্ত্বা বা তত্ত্ব সম্পর্কে আলোচনা করে তাহাকে তত্ত্ব বিদ্যা বলে । ইহা আবার কয়েকটি উপ-শাখায় বিভক্ত।
ক) পরম সত্ত্বা সম্পর্কীয় তত্ত্ববিদ্যা ঃ পরম সত্ত্বা সম্পর্কিত বিশেষতঃ আধ্যাত্মিক, পারলৌকিক, সৃষ্টিকর্তা ও তাহার অস্তিত্ব, আত্মা, ধর্মীয় মতবাদ প্রভৃতি সম্বন্ধে এই শাখায় আলোচনা করা হয়
খ) মন সম্পর্কীয় তত্ত্ববিদ্যা ঃ ইহার আলোচ্য বিষয় মন। বিভিন্ন ভাবাবেগ, ভাবান্তর, মানসিক যাবতীয় বিষয় এই শাখায় আলোচনা করা হয়।
গ) জড়বস্তু সম্পৰ্কীয় তত্ত্ববিদ্যা ঃ এই শাখায় জড়বস্তু সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। নিশ্চিত বিজ্ঞান ও অনিশ্চিত বিজ্ঞান এই শাখার আওতাভূক্ত।
iii) রূপবিজ্ঞান : দৃশ্যমান জগতের রূপ সৌন্দর্য নিয়া বিজ্ঞানের মত দর্শনও আলোচনা করে। দর্শনের যে শাখা দেশ কালের প্রেক্ষিতে জড়বস্তু মন ও প্রাণের প্রকাশিত রূপের আলোচনা করে তাহাকে রূপ বিজ্ঞান বলে ।
iv) আদর্শ বিদ্যা ঃ দর্শনের এই শাখায় কোন বিষয়ের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। মূল্যের শ্রেণীবিন্যাস ও সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের আদর্শ, মানবতাবাদ সে সাথে মহান সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্ক বিষয়ক আলোচনাও এই শাখার অন্তর্ভূক্ত।
দর্শনের মতবাদ
দর্শনের মতবাদ গুলি হল –
১ । জড়বাদ ২। ভাববাদ
৩ । প্রাণবাদ
৪ । যন্ত্রবাদ ৫ । বিবর্তনবাদ
৬ । অভিজ্ঞতাবাদ
৭ । সজ্ঞাবাদ ইত্যাদি
ভাববাদ (Idealism): ভাববাদের মূল কথা হল- সমগ্ৰ জগত মনের ধারণা ব্যতীত অন্য কিছু নয় (The whole world is an idea of mind) ইহা দুই প্রকার যথা,
(ক) আত্মগত ভাববাদ (Subjective idealism)- এই ভাববাদের প্রবর্তক বার্কলি । তাহার মতে বহির্জগত আমাদের মনের ধারণা মাত্র । আমাদের মনের বাহিরে সত্য বলিয়া কিছুই নাই ।
(খ) বস্তুগত ভাববাদ (Objective idealism)- হেগেল বস্তুগত ভাববাদের জনক । তাহার মতে সর্বস্রষ্টা এক আধ্যাত্মিক অমূর্ত সত্তা, জড়জীবন তাহারই মূর্ত প্রকাশ । সকল অসীম বস্তু ও ব্যক্তি এই অসীমের মধ্যে চলে ফিরে, মরে ও বাঁচে ।
ভাববাদের আলোচনার আওতায় এমনসব মতবাদ পড়ে যে সব মতবাদ জগত প্রক্রিয়া নিরূপনের ক্ষেত্রে আধ্যাত্মিক জগত বা অজড়াত্মক শক্তির কথা বলে। ভাববাদীদের মতে বিশ্বজগত মনের উপর নির্ভরশীল, মনের ধারণ ছাড়া ইহা অন্য কিছুই নয় । ভাববাদের মূল বক্তব্য মন নিরপেক্ষ কোন সত্ত্বা নাই । ঝাড়ফুক, পানি পড়া, তাবিজ দিয়া, চিকিৎসার চিকিৎসকগণকে ভাববাদের অন্তর্ভূক্ত বলা যায়। তাহাদের বিশ্বাস কতকগুলি রোগ আছে যাহাদিগকে বলা হয় আসমানী, বালা । এই গুলি ঔষধ দিয়া আরোগ্য করা যায় না। আধ্যাত্মিক বলে এইগুলি আরোগ্য করা সম্ভব ।
প্রাণবাদ: মানুষ যখন সুস্থ্য থাকে তখন জীবণীশক্তি তার ক্ষুধা, নিদ্রা, বিশ্রাম, দেহের ক্ষয় পূরণ ও বৃদ্ধি সাধন করে । আর যখন অসুস্থ্য থাকে তখন অতিরিক্ত কাজ হিসাবে বিভিন্ন শারিরীক ও মানসিক লক্ষণ প্রকাশ করিয়া বাহিরের শক্তির সাহায্য প্রার্থনা করে ।
ডাঃ হ্যানিম্যান ছিলেন একজন প্রকৃত বৈজ্ঞানিক, ফলে বিনা বিচারে, বিনা পরীক্ষায়, বিনা প্রমাণে কোন কিছু গ্রহণ করা তাঁর স্বভাবে ছিল না। তিনি জীবনী শক্তিকে অদৃশ্য, গতিশীল ও ঐশ্বরিক শক্তি বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন । রোগ নির্ণয়ে তিনি দেহ, মন, অনুভূতি, মেজাজ, স্বভাব চরিত্র প্রভৃতির অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়া না আসা পর্যন্ত তাহাকে আরোগ্য বলিয়া স্বীকার করেন নাই। তিনি প্রাণ, মন, জীবনীশক্তি সবকিছুরই সত্তায় বিশ্বাস করতেন।
নির্বিচারবাদ (Dogmatism): জ্ঞানের সীমা, বৈধতা, শর্ত, উৎপত্তি প্রভৃতি সম্পর্কে জ্ঞানবিদ্যার যথার্থ কোন আলোচনা বা বিচার বিবেচনা না করিয়া দর্শনের প্রধান সমস্যাবলী সমাধানের জন্য সরাসরিভাবে পূর্বকল্পিত ধারণার বশবর্তী হইয়া যে মত বা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয় তাহাকে নির্বিচার বাদ বলা হয়। এই মতবাদের প্রবক্তারা জ্ঞানের সম্ভাব্যতা ও সীমা নিয়া যথার্থ আলোচনা না করেই কতকগুলি নীতিকে স্বতঃসিদ্ধ বলিয়া মনে করেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সচেষ্ট হন । তাহারা নির্বাচারে তত্ত্বালোচনা শুরু করেন আর বিনা বিচারেই এই পদ্ধতিকে যথার্থ পদ্ধতি বলিয়া মনে করেন । এই শ্রেণীর দার্শনিকগণ নির্বিচারবাদী নামে পরিচিত । ইহাদের দুই ভাগ আছে, যথা—
১ । যুক্তিবাদী
২। অভিজ্ঞতাবাদী ।
জড়বাদের (বস্তুবাদের) ধারণা উল্লেখ কর:
জড়বাদ (Materialism) · জড়বাদ জড়কে আদিসত্ত্বা বলে মনে করে। গতি হচ্ছে জড়ের ধর্ম । বিশ্ব জগতের যাবতীয় বস্তু জড় বা পরমাণুর আকর্ষন বিকর্ষণের ফলে সৃষ্ট হয় । মন বা আত্মা বলে কোন আদি সত্ত্বা নেই । রবং মন-প্রাণ জড় থেকে উদ্ভূত । জড়বাদ যান্ত্রিক বিবর্তনবাদে এবং জড়বাদের প্রকৃতির মধ্যে কতকগুলো বৈশিষ্ট্য আছে, যেমন-
১। জগতের যাবতীয় বস্তু জড়ের আকর্ষন ও বিকর্ষণের ফলে সৃষ্টি হয় । এই সৃষ্টি কতকগুলি যান্ত্রিক নিয়মের অধীন ।
২ । জড়বাদে অলৌকিক বা আধ্যাত্মিক শক্তির স্থান নাই ।
৩। প্রত্যক্ষণই একমাত্র জ্ঞান লাভের উপায়, যা প্রত্যক্ষণের বিষয় নয় তার অস্তিত্ব স্বীকার করা যায় না ।
৪। জড়বাদ যান্ত্রিক বিবর্তনবাদে বিশ্বাসী, তারা মনে করেন বিবর্তনের মাধ্যমে জড়শক্তিই প্রাণশক্তিকে পরিবর্তিত হয়ে থাকে ।
আধ্যাত্মবাদ: আধ্যত্মবাদী- দার্শনিকগণ জগতের আধ্যাত্মিক ব্যখ্যা দিয়াছেন । জড়বাদ যেমন বস্তু ও মনকে জড় পরিণত করিয়াছে, তেমনি আধ্যাত্মবাদ জড়কে আত্মায় পর্য্যবেশিত করিয়াছে, নিশ্চল স্থানুবৎ প্রাণহীন পদার্থ বলিয়া কিছু নাই । সবই পরম আত্মা থেকে উদ্ভুত । পরম আত্মাই সব কিছুর মূলে । পরম আত্মা বা খোদাই একমাত্র সত্য । আর সবই তাহারই অবভাস (Apperance)। খোদাই একমাত্র সত্য ।
সত্ত্বাবাদ (Substantialism): দর্শনে প্রাণবাদের পরিবর্তিত ও রূপান্তরিত নাম সত্ত্বাবাদ । সত্ত্ববাদের মূল কথা হল বিশ্বপ্রকৃতির দৃশ্য অদৃশ্য সবকিছুই সত্য। জীবদেহ ও আত্মা সবকিছুই বস্তু । এই হিসাবে জীবন, আত্মা, শব্দ, গন্ধ, আলো বাতাস, শক্তি যা দেখা যায়, অনুভব করা যায় কিছুরই সত্ত্বা আছে । হ্যানিম্যানের নিকট আত্মা, পদার্থ, শক্তি, গতি, দেহ, মন, স্বাস্থ্য, ব্যাধি ইত্যাদি সঙ্কুচিত, বর্দ্ধিত ও পরিবর্তিত সর্ববস্থায় সত্য ও বাস্তব। তবে তাহার দৃঢ় অভিমত এই যে সব কিছুকেই সঙ্গত ও স্বাভাবিকভাবেই কাজে লাগাইতে হইবে । তাই হ্যানিম্যান একজন সত্ত্বাবাদী দার্শনিক ।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে দর্শনের ভূমিকা :
সৃষ্টির প্রথম থেকেই মানুষ রোগ শোকে আক্রান্ত হতো, তাই ঐ সব রোগ ও কষ্টের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে মানুষ নানা চেষ্টা তদবির শুরু করে । মানুষ সর্বদা চেষ্টা করে আসছে রোগের প্রকৃত কারণ নির্ণয় করতে । এর জন্য আশ্রয় নিয়েছে কল্পনা, অনুমান ও বিভিন্ন দার্শনিক মতবাদের । চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাস পর্যালোচনা করিলে দেখা যায় চিকিৎসা ক্ষেত্রে দর্শনের বিড়াট ভূমিকা রয়েছে।
দর্শনের মতবাদ গুলি হল –
১ । জড়বাদ ২। ভাববাদ
৩ । প্রাণবাদ
৪ । যন্ত্রবাদ ৫ । বিবর্তনবাদ
৬ । অভিজ্ঞতাবাদ
৭ । সজ্ঞাবাদ ইত্যাদি
,এই গুলির মধ্যে জড়বাদ, প্রাণবাদ, যন্ত্রবাদ, ভাববাদ ও বিবর্তনবাদ চিকিৎসা শাস্ত্রের সহিত জড়িত ।
জড়বাদ— প্রতিটি বস্ত্র স্বাভাবিক অবস্থায় জড় বলে মনে হয়, কিন্তু কোন বস্তু যখন হোমিওপ্যাথিক ফার্মাকোপিয়ার নির্দিষ্ট নিয়মে শক্তিকৃত করা হয় তখন তাহা প্রাণীদেহের রোগ নির্মূল করে ।
ভাববাদ- শক্তিকৃত ঔষধ যখন সুস্থ্যদেহে বা অসুস্থ্য দেহে প্রয়োগ করা হয় তখন শারিরীক ও মানসিক উভয় লক্ষণেরই পরিবর্তন হয় ।
প্রাণবাদ- মানুষ যখন সুস্থ্য থাকে তখন জীবণীশক্তি তার ক্ষুধা, নিদ্রা, বিশ্রাম, দেহের ক্ষয় পূরণ ও বৃদ্ধি সাধন করে । আর যখন অসুস্থ্য থাকে তখন অতিরিক্ত কাজ হিসাবে বিভিন্ন শারিরীক ও মানসিক লক্ষণ প্রকাশ করিয়া বাহিরের শক্তির সাহায্য প্রার্থনা করে ।
যন্ত্রবাদ- দেহের ভিতর কোন অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটিলে তা জানা যায় যন্ত্রের সাহায্যে, আবার শরীরে কোন অঙ্গ সংযোজন, বিয়োজন বা জোড়া লাগানোর জন্য যন্ত্রের সাহায্য নেওয়া হয় ।
বিবর্তনবাদ— আদিরোগ বীজ সোরা- বিবর্তনের মাধ্যমে তা বর্তমানে সিফিলিস, সাইকোসিস ও টিউবারকুলিনামে পরিবর্তিত হয়েছে । সুতরাং চিকিৎসা ক্ষেত্রে দর্শনের বিড়াট ভূমিকা রয়েছে ।
দর্শন বিজ্ঞানসম্মত জ্ঞান এবং জ্ঞানের সমালোচনা:
‘দর্শন বিজ্ঞানসম্মত জ্ঞান এবং জ্ঞানের সমালোচনা’– ইহা দার্শনিক কেন্টের উক্তি ।
কোন মতবাদ বা ধারণা যখন পরীক্ষা নিরীক্ষা দ্বারা সত্য বলিয়া প্রমাণ করা যায়, পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে একই নিয়মে পরীক্ষা করলে একই সত্য পাওয়া যায় তখন তাকে বিজ্ঞানে বলে । আগুনে হাত দিলে হাত পুড়ে ফোস্কা পড়ে যায় । কিন্ত মৃত দেহ পুড়ালে ফোস্কা পড়ে না । দর্শনের কাজ হলে যুক্তিপূর্ণ ব্যখ্যা ও সমালোচনা । জীবন্ত মানুষের মধ্যে জীবনী শক্তি সচল থাকে । আগুনের ক্রিয়ার ফলে দেহ পুড়ে যায়- জীবনীশক্তি তার প্রতিক্রিয়ায় দেহে ফোস্কা তৈরি করে । কিন্তু মৃত দেহে যেহেতু জীবণীশক্তি নাই তাই ফোস্কা পড়ে না। দর্শন হল বিজ্ঞানের বিজ্ঞান । জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা থেকে বিজ্ঞান যে তথ্য আহরণ করে তার সমন্বয় সাধন করাই হল দর্শনের আসল উদ্দেশ্য ।
কার্যকারণ তত্ত্বটি আলোচনা কর :
কার্যকারণ তত্ত্ব (The Law of cousation) প্রকৃতিতে বিনা কারণে কোন ঘটনা ঘটেনা । প্রতিটি ঘটনার পিছনে কোন কারণ থাকে । যেমন সমুদ্রে ভূমিকম্প হলে জলচ্ছাস হয়। দুষিত পানি পান করিলে ডায়রিয়া হয়, ডায়রিয়া হলে দেহে পানি শূন্যতা হয । সুতরাং কারণ হল এমন একটি শক্তি যা বস্তুর পরিবর্তন করে, বস্তুকে গতি দান করে বা ক্রিয়াশীল করে । নিছক শূন্য হইতে কোন ঘটনা ঘটিতে পারে না । ধরি কিয়ামতের সময় পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে কিন্তু কিভাবে? পৃথিবীর গর্ভে যত আনবিক বোমা মজুত আছে তা যদি কোন কারণে বিস্ফোরিত হতে থাকে তাহলে পৃথিবীর ধ্বংস অনিবার্য। তাই বলা যায় যেখানে কোন কারণ নাই, যেখানে কোন ঘটনাও নাই ।
কলা: কলার অর্থ কোন কিছু করার পদ্ধতি বা কোন কাজকে বিজ্ঞান ভিত্তিক উপায়ে সম্পূর্ণ করার কতগুলি সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি নির্ধারণ ।
বিজ্ঞান ও কলার মধ্যে পার্থক্য:
বিজ্ঞান | কলা |
বিজ্ঞান দ্বারা মানুষ প্রকৃতিকে জানতে পেরেছে | কলার বিদ্যা দ্বারা মানুষ বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত নিয়মনীতি অনুসারে নির্দিষ্ট কর্ম নিপুণভাবে সুসম্পন্ন করিতে শিখিয়াছে । |
বিজ্ঞান হল মতবাদ | কোন কাজকে বিজ্ঞান ভিত্তিক উপায়ে সম্পূর্ণ করার কতগুলি সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি । |
বিজ্ঞান কোন কিছু জানার শিক্ষা দেয় । | কলা কোন কিছু করার শিক্ষা দেয় । |
বিজ্ঞান আইন ও কারণে অস্তিত্ব বর্ণনা করে । | কলা কোন কিছুর সৃষ্টির কৌশল শিক্ষা দেয় । |
প্রত্যেক বিজ্ঞান কলার মাধ্যমে প্রকাশিত হয় । | প্রত্যেক কলার ভিত্তি বিজ্ঞানের উপর প্রতিষ্ঠিত । |
হোমিওপ্যাথি একটি বিজ্ঞান ও কলা- ব্যাখ্যা :
হোমিওপ্যাথি একটি বিজ্ঞান- বিজ্ঞান বলতে আমরা বুঝি কোন বিষয় সম্বন্ধে সুসংহত জ্ঞান, যা পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার দ্বারা প্রমানিত হয় এবং পরীক্ষিত সেই জ্ঞান থেকে কতকগুলো সাধারণ সূত্র আবিষ্কার
করা হয় ।
হোমিওপ্যাথিক ফার্মাকোপিয়ার নির্দিষ্ট নিয়মে কোন, হোমিওপ্যাথিক ঔষধ প্রস্তুত করে তা সুস্থ্য মানুষের দেহে প্রয়োগ করিলে কতকগুলি শারিরীক ও মানসিক লক্ষণ সৃষ্টি হয়। এই লক্ষণগুলির অধিকাংশ লক্ষণের সদৃশ লক্ষণ যদি কোন প্রাকৃতিক পীড়ায় আক্রান্ত রোগীর মধ্যে দেখা দেয় এবং তাকে ঐ ঔষধ খাওয়ান হয় তাহলে রোগটি চিরতরে নির্মূল হয়ে যায় । ইহা পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে র লোকের জন্য সত্য ।
সুতরাং হোমিওপ্যাথি একটি বিজ্ঞান ।
হোমিওপ্যাথি একটি আদর্শ আরোগ্য কলা— কলার অর্থ কোন কিছু করার পদ্ধতি বা কোন কাজকে বিজ্ঞান ভিত্তিক উপায়ে সম্পূর্ন করার কতগুলি সুনির্দিষ্ট নিয়ম নীতি নির্ধারণ । নিম্নোক্ত হোমিওপ্যাথিক আরোগ্য নীতিগুলি হোমিওপ্যাথিক যে একটি আদর্শ আরোগ্য কলা তা প্রমান করে ।
১ । সদৃশ দিয়ে সদৃশ চিকিৎসা ।
২ । ঔষধ পরীক্ষণ । 1.
৩। ঔষধের শক্তিকরণ ।
৪ । একক ঔষধ ।
৫ । একক মাত্রা ।
৬। সূক্ষ্ম ও পরিবর্তিত মাত্রা ।
৭। রোগীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও ঔষধের সত্ত্বার স্বাতন্ত্র নির্ণয় ।
৮ । রোগ নয় রোগীকে চিকিৎসা করা ।
৯ । রোগীকে আংশিক বা আঙ্গিকভাবে নয়, সামগ্রীকভাবে চিকিৎসা করা ৷
১০ । আরোগ্য করতে হবে কম সময়ে, কম কষ্টে, কম খরচে এবং নির্দোষ ও স্থায়ীভাবে
প্রকৃতির নিয়মানুবর্তিতা নীতি কি:
প্রকৃতির কিছু স্বাভাবিক এবং চিরন্তর নীতি আছে। এই নীতিগুলি অপরিবর্তনশীল । পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে ইহা একই নিয়ম মেনে চলে । যেমন –
১। সূর্য পূর্ব দিক হতে উদয় হয়, পশ্চিমে অস্ত যায় ।
২। পানি হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন পরমাণু দ্বারা গঠিত- দুনিয়ার কোথাও এর ব্যতিক্ৰম নাই ।
৩। জলাশয়ের পানি বাষ্প হয়ে আকাশে মেঘের আকারে জমা হয়, আবার ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টির আকারে নীচে নেমে এসে জলাশয় ভরাট করে ।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা একটি প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতি । কারণ ইহা প্রকৃতির নীতিকে নির্ভুলভাবে অনুসরণ করে। হোমিওপ্যাথিতে আরোগ্যের প্রাকৃতিক নীতিটি হল, “Similia, similibus, curentur”. অর্থ্যাৎ সদৃশ দ্বারা সদৃশ আরোগ্য হোক। প্রকৃতিতে আমরা দেখি দুটি চুম্বক দন্ড সমমেরুতে বিকর্ষ করে এবং বিপরীত মেরুতে আকর্ষণ করে । চুম্বকের এই নীতির প্রতিফলন আমরা দেখি হোমিওপ্যাথিক আরোগ্য নীতিতে। আমাদের দেহে পূর্ব থেকে কোন রোগ থাকিলে ঐ রোগের বিসদৃশ কোন ঔষধ প্রয়োগ করিলে ঔষধ দ্বারা সৃষ্ট রোগ ও পূর্ব থেকে অবস্থানরত রোগ পরস্পর আকর্ষিত হয়ে সহ অবস্থান করে রোগীর কষ্ট আরো বাড়িয়ে তোলে । যেমন – ডায়াবেটিসে এলোপ্যাথিক চিকিৎসা ।
আবার সদৃশ বিধানে আমরা দেখি দেহে পূর্ব থেকে কোন রোগ অবস্থান করিলে এবং ঐ রোগের লক্ষণ সদৃশ কোন ঔষধ প্রয়োগ করিলে, চুম্বকের প্রাকৃতিক নীতি অনুসারে পরষ্পর দূরে সরে যায় অর্থ্যাৎ যেটি শক্তিশালী সেটি দুর্বলটিকে দূরে সরিয়ে দেয়, যেহেতু ঔষধশক্তি রোগশক্তি হতে শক্তিশালী তাই ঔষধশক্তি রোগ শক্তিকে দেহ হতে বের করে দেয় । আবার ঔষধের স্থায়িত্ব যেহেতু অল্প তাই শীঘ্রই দেহ ঔষধের প্রভাবমুক্ত হয় ।
আবার নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুসারে “প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত ক্রিয়া আছে।” সদৃশ ঔষধশক্তি তার সমান শক্তি দিয়ে সদৃশ রোগ শক্তিকে আক্রমন করে ধ্বংস করে দেয় । রোগশক্তিকে ধ্বংস-করে ঔষধশক্তির অবশিষ্ট শক্তি তখন জীবনীশক্তিকে আক্রমন করে, ফলে রোগ লক্ষণের বৃদ্ধি হয় । এখানে ঔষধশক্তি তার সমান ক্রিয়া বা শক্তি ধারা রোগশক্তিকে ধ্বংস করল । জীবনী শক্তি প্রতিক্রিয়ায় বা ঔষধের বিপরীত ক্রিয়ায় জীবনীশক্তি, রোগ লক্ষণের বৃদ্ধি ঘটাল ।
থেলিস (Thales): বিশ্বজগতের আদি বস্তুর নাম করতে গিয়ে থেলিসই সর্বপ্রথম পানির কথা বলেন । আইয়োনিয়া দ্বীপের বাসিন্দা পাশ্চত্য দর্শনের জনক থেলিস বলেন যে পানি এই জগতের আদি বস্তু । কেননা পানি থেকেই সব কিছু উদ্ভুত হয় এবং পানিতে সব কিছু বিলীন হয়ে যায় । পানি যেহেতু এই বিশ্ব জগতের একটি গুরুত্ব পূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করছে তার উপর ভিত্তি করেই মনে হয় থেলিস পানিকেই বিশ্বজগতের আদি বস্তু হিসাবে গ্রহণ করেছেন । কিন্তু পানি থেকে বিভিন্ন বস্তু কিভাবে সৃষ্টি হতে পারে সে সম্পর্কে কোন স্পষ্ট ব্যখ্যা থেলিস দিতে পারেননি । তাছাড়া পানি নিজেই একটি জাগতিক বস্তু এবং সে হিসাবে পানি অন্যান্য জাগতিক বস্তুর মূল উপাদান কিভাবে হতে পারে সে সম্পর্কেও থেলিস কোন সন্তোষজনক ব্যখ্যা দিতে পারেননি ।
দর্শনের জনক কে? দর্শনের পরিসর বলিতে কি বুঝ:
দর্শনের জনক— আইয়োনিয়ান পিরিয়ডে তিনজন স্বনামধন্য দার্শনিকের পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁরা হলেন থেলিস (Thales), এনাক্সিমেনডার (Anaximander) এবং এনাক্সিমিনেস (Anaximens)। এই তিনজনের এক জনকে দর্শনের জনক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তবে অধিকাংশ দার্শনিকের মতে থেলিসই দর্শনের জনক ।
বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি খন্ড এবং দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গি অখন্ড— ব্যখ্যা কর:
বিজ্ঞান দৃশ্য জগতের ভিন্ন ভিন্ন বিভাগের পৃথক পৃথক বস্তু লইয়া তাহার ক্রিয়া -কলাপ চালায়। বিজ্ঞান যে কোন ধারণা, বিশ্বাস, মতামতের উপর গবেষণা চালিয়ে তার যথার্থতা ও নির্ভুলতা আবিষ্কার করে, ফলে বার বার তা পরীক্ষা করলে একই ফলাফল পাওয়া যায় । বিজ্ঞান তার গবেষণার ফলকে এমন একটা নীতির আওতায় আনে যে বিশ্বের যে কোন স্থানে তা প্রমাণ করা যায় । যেমন সাধারণ অবস্থায় ১০০°C তাপমাত্রায় পানি বাষ্পে পরিণত হয়। এই আবিষ্কার সকল দেশে যে কোন সময় প্রমাণ করা যায় ।
পক্ষান্তরে দর্শনের আলোচনার কোন নির্দিষ্ট বিষয় নাই। দৰ্শন দৃশ্য, অদৃশ্য, আধ্যাত্মিক যে কোন বিষয় নিয়ে যুক্তি, আলোচনা, সমালোচনা, পর্যালোচনা, ব্যখ্যা প্রদান করিতে পারে । ফলে দর্শন হয়ে উঠে যে কোন সত্য আবিষ্কারের প্রথম দ্বার । দর্শন না থাকলে আমরা, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার জীবনীশক্তি ঔষধের শক্তি, রোগশক্তি ইত্যাদি আত্মাধিক বস্তুর ব্যখ্যা দিতে পারতাম না ।
তাই বিজ্ঞান ও দর্শনের আলোচনায় আমরা দেখিলাম বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি খণ্ড এবং দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গি অখণ্ড । ক্ষমতা কিসের উপর নির্ভর করে?
শক্তির নিত্রতার সূত্র (Law of conservation of energy) – এই সূত্র অনুসারে শক্তির ধ্বংস নাই । ইহা অবিনশ্বর, ইহার ক্ষয় নাই । শক্তির রূপের পরিবর্তন ঘটে কিন্তু পরিমাণের কোন পরিবর্তন হয় না । যেমন পানির স্রোতের গতিশক্তি দ্বারা জেনারেটর হতে বিদ্যুৎ শক্তি তৈরি হয়, বিদ্যুৎ শক্তি আলোক শক্তিতে পরিণত হয়, আলোক শক্তি তাপ শক্তিকে পরিণত হয় ইত্যাদি। এক বস্তু যে পরিমাণ শক্তি হারায় অন্য বস্তু ঠিক সেই পরিমাণ শক্তি অর্জন করে ।
প্রতিক্রিয়া: নিউটিনের তৃতীয় গতি সূত্র অনুসারে প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। বন্দুকের গুলি ছুড়িলে বন্দুক পিছন দিকে ধাক্কা দেয় । বন্ধুকের গুলি বের হয়ে যাওয়া একটি ক্রিয়া, এই ক্রিয়ার ফলে বন্দুক পিছন দিকে ধাক্কা দেয়, এই পিছন দিকে ধাক্কা দেওয়াটা হল বিপরীত প্রতিক্রিয়া । আগুনে হাত দিলে হাত পুড়ে ফোস্কা পড়ে। আগুনের ক্রিয়ার ফলে হাত পুড়ে, জীবনীশক্তির প্রতিক্রিয়ার ফলে হাতে ফোস্কা পড়ে । ঔষধ সেবন করিলে ঔষধশক্তি রোগ শক্তির উপর ক্রিয়া করে, ফলে রোগ নিমূর্ল হয় এবং- রোগশক্তির বা জীবনী শক্তির বিক্রিয়ায় রোগ লক্ষণের বৃদ্ধি ঘটে ।
বিজ্ঞানের সহিত দর্শনের সম্পর্ক আলোচনা কর?
বিজ্ঞান— কোন মতবাদ বা ধারণা যখন পরীক্ষা নিরীক্ষা দ্বারা সত্য বলিয়া প্রমাণ করা যায়, পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে একই নিয়মে পরীক্ষা করলে একই সত্য পাওয়া যায় তখন তাকে বিজ্ঞানে বলে । আগুনে হাত দিলে হাত পুড়ে ফোস্কা পড়ে যায় । কিন্ত মৃত দেহ পুড়ালে ফোস্কা পড়ে না ।
দর্শন— জীবন ও জগতের সাথে জড়িত বিভিন্ন সমস্যার যুক্তিপূর্ণ ব্যখ্যা ও সমালোচনাকে দর্শন বলে । দর্শনের কাজ হল যুক্তিপূর্ণ ব্যখ্যা ও সমালোচনা । জীবন্ত মানুষের মধ্যে জীবনী শক্তি সচল থাকে । আগুনের ক্রিয়ার ফলে দেহ পুড়ে যায়— জীবনীশক্তি তার প্রতিক্রিয়ায় দেহে ফোস্কা তৈরি করে । কিন্তু মৃত দেহে যেহেতু জীবণীশক্তি নাই তাই ফোস্কা পড়ে না। দর্শন হল বিজ্ঞানের বিজ্ঞান । জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা থেকে বিজ্ঞান যে তথ্য আহরণ করে তার সমন্বয় সাধন করাই হল দর্শনের আসল উদ্দেশ্য ।
বিজ্ঞান ও দর্শনের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ কর :
বিজ্ঞান | দর্শন |
বিজ্ঞান দ্বারা মানুষ প্রকৃতিকে জানতে পারছে । | দর্শন জ্ঞানের যে কোন শাখার যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা ও সমালোচনা করে। |
বিজ্ঞান দ্বারা জ্ঞানের যথার্থতা ও নির্ভুলতা জানা যায় ৷ | দর্শন দ্বারা জ্ঞান অনুমান, যুক্তি, সমালোচনা করে জ্ঞানের সম্পূর্ণতা অর্জন করা যায় । |
বিজ্ঞান বর্ণনা করে । | দর্শন ব্যাখ্যা করে । |
বিজ্ঞান অনেক জটিল বিষয় সম্বন্ধে এখনো ব্যাখ্যা দিতে পারে না । | দর্শন অনেক জটিল ও শক্ত সম্বন্ধে বিষয় নিয়ে আলোচনা করে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করে । |
বিজ্ঞান জ্ঞান ও সত্যের উপর লক্ষ্য রাখে । | দর্শন প্রতিটি পদক্ষেপের উপর দৃষ্টি রাখে । |
বিজ্ঞান দর্শন হিসেবে শুরু হয় এবং কলা হিসেবে শেষ হয় । | দর্শন আনুমানিক ব্যাখ্যা এবং সত্য উদঘাটনের প্রথম দ্বার । |
বিজ্ঞানের নির্দিষ্ট সীমা আছে এবং নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে । বিজ্ঞান যুক্তি সঙ্গতভাবে একটি নির্দিষ্ট আইন প্রতিষ্ঠিত করে । | দর্শন স্থির ও জটিল বলে মনে হয় । দর্শন তার জয়ের ফল বিজ্ঞানের কাছে অর্পণ করে সন্তুষ্ট মনে নতুন অনিশ্চিতের মধ্যে নিজেকে অর্পণ করে । |
সংক্ষেপে আরোহ ও অবরোহ পদ্ধতি উদাহরণসহ ব্যাখ্যা কর: আরোহ পদ্ধতি (Inductive method) একজন হোমিও চিকিৎসক রোগলিপি তৈরির সময় যখন রোগীর দৈহিক ও মানসিক বিস্তারিত লক্ষণের সাথে হ্রাস-বৃদ্ধি, পূর্বের রোগের ইতিহাস, বৈবাহিক অবস্থা, বংশানুক্রমিক বৈশিষ্ট্য (পারিবারিক ইতিহাস), প্রসূতি সংক্রান্ত তথ্য, পেশা, উত্তেজক কারণ, পরিপোষক কারণ, রোগের কারণ ইত্যাদি তথ্য সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধ করেন তাকে আরোহ পদ্ধতি বলে ৷
অবরোহ পদ্ধতি (Deductive method) একজন হোমিও চিকিৎসক রোগলিপি তৈরির জন্য যখন কেবল মাত্র দৈহিক ও মানসিক লক্ষণের বিস্তারিত বিবরণ সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধ করেন তাকে অবরোহ পদ্ধতি বলে ।
হোওিপ্যাথিক দর্শন বলিতে কি বুঝ?: চিকিৎসা ক্ষেত্রে দর্শনের ভূমিকা ব্যখ্যা কর ।
হোমিওপ্যাথিক দর্শন- চিকিৎসা দর্শনের যে শাখায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার বিষয়বস্তু, নিয়মনীতি আদর্শসহ নিম্নোক্ত বিষয়গুলি সম্পর্কে জানা যায় তাকে হোমিওপ্যাথিক দর্শন বলে, যেমন
১। রোগ প্রতিরোধ ও রোধ আরোগ্যে জীবনীশক্তির ভূমিকা ।
২। সুস্থ্য ও অসুস্থ্য দেহে স্থূল ও সূক্ষ্মমাত্রার ঔষধ এবং নিম্ন ও উচ্চশক্তি সম্পন্ন ঔষধের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া ।
৩ । রোগের মৌলিক কারণ ।
৪ । রোগ, রোগী ও চিকিৎসকের সম্পর্ক
৫। কিভাবে, কখন, কোন নিয়মে ঔষধ প্রয়োগ করিলে রোগী নিরূপদ্রবে আরোগ্যে লাভ করে ।
৬। রোগ আরোগ্যের জন্য প্রাকৃতিক নীতির উপর নির্ভর করিয়া সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন ইত্যাদি ।
রোগী কে: দৈহিক ও মানসিক কষ্ট, পরিবর্তিত অনুভূতি, মেজাজ ও স্বভাব এবং রোগের হ্রাস বৃদ্ধিসহ সমস্ত ব্যক্তিটিকে রোগী বলে। সামগ্রিক রোগের প্রতিনিধি হল রোগী । হ্যানিম্যান শুধু চিকিৎসা দার্শনিক ছিলেন না, তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও চিকিৎসা দার্শনিক ছিলেন । যেহেতু সমস্ত কষ্টকর লক্ষণসহ আক্রান্ত ব্যক্তিটাই রোগী তাই দার্শনিক চিন্তা চেতনা থেকে তিনি বলেছেন, “রোগীকে চিকিৎসা কর, রোগকে নয় ।”
“রোগ নয় রোগীর চিকিৎসা” ব্যখ্যা কর:
ঔষধ পরীক্ষাকালে দেখা গিয়াছে একই ঔষধ কোন প্রুভারের মধ্যে ৭/৮টি লক্ষণ প্রকাশ করেছে এবং কোন প্রুভারের মধ্যে ৭/৮টি লক্ষণ প্রকাশ করেছে এবং কোন প্রুভারের মধ্যে প্রচুর সংখ্যক লক্ষণ প্রকাশ করেছে, কোন প্রুভারের মধ্যে মাত্র ২/১টি লক্ষণ প্রকাশ করেছে । এর একমাত্র কারণ প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ভিন্ন, তাই ঔষধটির প্রতি তাদের লক্ষণ সৃষ্টির প্রবণতা ভিন্ন
আবার মনে করি তিনজন মাথা ব্যথার রোগী । একজনের বৃদ্ধি দুপুর বেলা, একজনের বৃদ্ধি সকাল হতে সন্ধ্যা বেলা পর্যন্ত এবং অন্যজনের বৃদ্ধি রাতের বেলায় । তিনজনের রোগের নাম একই হলেও লক্ষণ অনুসারে তিনজনের তিনটি ভিন্ন ঔষধ হবে ।
সুতরাং বলা যায় রোগের নাম এক হলেও একটি নির্দিষ্ট ঔষধ সকলের উপর প্রয়োগ করা যায় না, অর্থ্যাৎ হোমিওপ্যাথিতে রোগের নয় রোগীর চিকিৎসা করা হয় ।
হোমিওপ্যাথিক দর্শনের মুল নীতিসমূহ লিখ:
১। সদৃশ বিধানে আরোগ্য সাধন- আরোগ্যের বিশ্বজনীন নিয়ম সিমিলিয়া, সিমিলিবাস, কিউরেন্টার (সদৃশ দ্বারা সদৃশ আরোগ্য হোক)
২। ভেষজ পরীক্ষা-সুস্থ্য মানদেহে ঔষধ পরীক্ষা করে তার রোগ উৎপাদন শক্তি নির্ণয় করতে হবে ।
৩। ঔষধের গতিশক্তি সৃষ্টিকরণ বা শক্তিকরণ- ভেষজপদার্থকে বিভাজিত, ঘর্ষণ, মর্দন, ঝাঁকানি মাধ্যমে এর অন্তর্নিহিত গুণাবলীর স্ফূরণ ঘটানো ।
৪। একক ঔষধ -একবারে একটি মাত্র ঔষধ প্রয়োগ করতে হবে ।
৫ । একক মাত্রা— একই আকৃতির ১০০টা অনুবটিকার ওজন এক গ্রেণ হয় এমন একটি অনুবটিকা শক্তিকৃত ঔষধ দ্বারা ঔষধিকৃত করলে এটা হবে একক মাত্রা ।
৬। সূক্ষ্ম বা ক্ষুদ্রতম ও পরিবর্তিত মাত্রা— একই আকৃতির ১০০টি অনুবটিকার ওজন এক গ্রেণ হয়, এমন একটি অনুবটিকা সিক্ত করতে যেটুকু শক্তিকৃত ঔষধের প্রয়োজন হয় সেই পরিমাণকে ক্ষুদ্রতম মাত্রা বলে ।
৭ । রোগীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও ঔষধের সত্ত্বার স্বাতন্ত্র্য নির্ণয় ।
৮ । রোগ নয় রোগীকে চিকিৎসা করা।
“সদৃশ প্রতিহত করে বিসদৃশ আকর্ষন করে” আলোচনা কর:
সদৃশ প্রতিহত করে- চুম্বক সমমেরুতে বিকর্ষণ করে তেমনি দুটি রোগশক্তি যাদের উৎস ভিন্ন (যেমন রোগ শক্তি ও ঔষধ শক্তি) তারা সদৃশ লক্ষণ সম্পন্ন হলে যেটি অধিকতর শক্তিশালী সেটি অন্যটিকে দেহ হতে বিতারিত করে । যেহেতু ঔষধশক্তি রোগশক্তি হতে শক্তিশালী তাই সদৃশ ঔষধশক্তি সদৃশ রোগশক্তিকে প্রতিহত করে ।
বিসদৃশ আকর্ষণ করে- চুম্বক বিপরীত মেরুতে আকর্ষণ করে । মানবদেহে যদি বিসদৃশ দুটি রোগ মিলিত হয় এবং নুতন রোগটি যদি পূর্বের অবস্থানরত রোগটি থেকে অধিকতর শক্তিশালী হয় তাহলে রোগ দুটি যার যার ক্রিয়াস্থলে অবস্থান করে রোগ লক্ষণ প্রকাশ করে জটিল লক্ষণসমূহের সৃষ্টি করে। এই ভাবে বিসদৃশ সিফিলিস সোরাকে বা সোরা সিফিলিসকে আকর্ষন করে পরস্পর স্বস্থানে অবস্থান করে রোগীর অবস্থা জটিল করে তোলে ।
একই শক্তির ঔষধ পুনঃ প্রয়োগের কুফল কি?:
কোন একটি শক্তির ঔষধ প্রথমবার প্রয়োগ করার পর জীবনীশক্তি তাহা বিনা শর্তে গ্রহণ করে এবং ঔষধটি জীবনীশক্তির উপর প্রত্যাশিত পরিবর্তন সাধন করে । কিন্তু বার বার একই শক্তির ঔষধ প্রয়োগ করিলে ঔষধ তার ক্ষমতার নির্দিষ্ট লক্ষণগুলি খুজে পায় না। ফলে রোগের বাকী লক্ষণের সঙ্গে ঔষধের লক্ষণগুলি মিলিয়া কতগুলি নুতন লক্ষণ প্রকাশ করে যা রোগীর প্রাথমিক রোগ লক্ষণের সদৃশ নয় এবং বার বার একই শক্তির ঔষধ প্রয়োগের ফলে ঔষধের লক্ষণগুলি স্থায়ী, লক্ষণে পরিণত হয় এবং একটি মিশ্র জটিল স্থায়ীরোগে পরিণত হয়ে রোগী অবস্থা দিন দিন অবণতির দিকে নিতে থাকে ।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় ব্যর্থতার কারণ কি কি ?:
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় কতগুলি সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন বা নীতি মেনে চলতে হয় । রোগী দেখা থেকে ঔষধ প্রদান পর্যন্ত কতগুলি পর্যায়ে বিভক্ত। যেমন- রোগীকে সরেজমিনে পরিক্ষা করে ও জিজ্ঞাসাবাদ করে রোগীর ব্যক্তিনিষ্ঠ ও বস্তু নিষ্ঠ লক্ষণ সংগ্রহ করে একটি নির্ভুল রোগ লিপি তৈয়ার করার জন্য রোগীর রোগের উত্তেজক কারণ, পরিপোষক কারণ এবং প্রধান কারণ, শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ সংগ্রহ করা হয় । তারপর ঔষধের শক্তি ও মাত্রা নির্ধারণ করতে হয় । এর পর পথ্য ও পরিচর্যার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হয় । তারপর ঔষধের ক্রিয়া পর্যবেক্ষণ ও দ্বিতীয় ব্যবস্থাপত্র তৈরি করতে হয় । উক্ত পর্যায়ের কোন একটি ধাপে ভুল হলে ব্যর্থতা অনিবার্য ।
হোমিওপ্যাথিক একটি আদর্শ আরোগ্য কলা ব্যখ্যা কর: হোমিওপ্যাথিক “একটি চিকিৎসা দর্শন, চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং আরোগ্য কলা ।
হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা দর্শন- হোমিওপ্যাথির চিকিৎসা দর্শন হল “Similia similibus curentur” অর্থ্যাৎ “সদৃশ দ্বারা সদৃশ আরোগ্য হোক” একথাটা হ্যানিম্যান সর্বপ্রথম ১৮১০ সালে তাঁর অর্গানন অব মেডিসিনের ১ম সংস্করণে উল্লেখ করেন । হ্যানিম্যানের বহু পূর্ব হিপোক্রেটিস বলেছিলেন যে, “সিমিলিয়া, সিমিলিবাস কিউরেন্টার, অন্যতম আরোগ্য পদ্ধতি” ।
হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বিজ্ঞান- শক্তিকৃত ঔষধ স্থুল মাত্রায় সুস্থ্যদেহে প্রয়োগ করিলে সুস্থ্য দেহে কতগুলি অস্থায়ী শারিরীক ও মানসিক লক্ষণ সৃষ্টি হয় । এই লক্ষন সমষ্টির অধিকাংশ লক্ষণের সদৃশ লক্ষণ যদি কোন প্রাকৃতিক পীড়াগ্রস্থ রোগীর মধ্যে দেখা যায় তাহলে ঐ ঔষধ শক্তিকৃত করে সূক্ষ্মমাত্রায় প্রয়োগ করিলে রোগী আরোগ্য হয় ।
হোমিওপ্যাথি একটি আদর্শ আরোগ্য কলা- কলার অর্থ কোন কিছু করার পদ্ধতি বা কোন কাজকে বিজ্ঞান ভিত্তিক উপায়ে সুনির্দিষ্ট নিয়ম নীতি নির্ধারণ। নিম্নোক্ত হোমিওপ্যাথিক আরোগ্য নীতিগুলি হোমিওপ্যাথি একটি চিকিৎসা দর্শন ও চিকিৎসা বিজ্ঞান তা প্রমান করে . যেমন
১ । সদৃশ নিয়মে চিকিৎসা করা ।
২। ঔষধ পরীক্ষণ— সুস্থ্য দেহে ঔষধ পরীক্ষা করে তার ফলাফল মেটেরিয়া মেডিকাতে লিপিবদ্ধ করা ।
৩। ঔষধের শক্তিকরণ- ঘর্ষন, মর্দন ও ঝাকানির মাধ্যমে বস্তুর স্থির শক্তিকে গতিশক্তিতে রূপান্তর ।
৪। একক ঔষধ- প্রতিবার একটি মাত্র ঔষধ সেবন ।
৫ । একক মাত্রা ।
৬ । সূক্ষ্ম ও পরিবর্তিত মাত্ৰা ।
৭। রোগীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও ঔষধের সত্ত্বার স্বাতন্ত্র্য নির্ণয় ।
৮ । রোগ নয় রোগীকে চিকিৎসা করা ।
৯। রোগীকে আংশিক বা অঙ্গিকভাবে নয়, সামগ্রীকভাবে
চিকিৎসা করা ।
১০ । আরোগ্য করতে হবে কম সময়ে, কম কষ্টে ও কম খরচে, নির্দোষ ও স্থায়ীভাবে। তাই দেখা গেল হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার নীতিগুলি যেমন স্থির, ইহার প্রয়োগ পদ্ধতিও তেমনি স্থির ও সুনির্দিষ্ট । সুতরাং হোমিওপ্যাতিক চিকিৎসা একটি আদর্শ আরোগ্য কলা ।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা দর্শনের গুরুত্ব বর্ণনা কর:
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় দর্শন বা হোমিওপ্যাথিক দর্শন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । দর্শনের জ্ঞান লাভ ছড়া প্রকৃত চিকিৎসক হওয়া সম্ভব নয় ।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় দর্শন পাঠের গুরুত্ব নিয়ে আলোচিত হল –
১। হোমিওপ্যাথিক দর্শন প্রাকৃতিক আরোগ্য নীতি শিক্ষা দেয় ।
২। হোমিওপ্যাথিক দর্শন রোগের মৌলিক ও উত্তেজক কারণগুলি নির্ণয় করিতে সাহায্য করে ।
৪ । অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতির সাথে হোমিওপ্যাথির সম্পর্ক ও পার্থক্য নির্ণয় করতে সাহায্য করে ।
৫। রোগী পরীক্ষা রোগ নির্ণয় ও ঔষধ নির্বাচনের পদ্ধতি শিক্ষা দেয় ।
৬। রোগের অবলুপ্তির কারণ নির্ণয় করতে এবং তা দূর করতে সাহায্য করে ।
৭ । ঔষধের মাত্রা ও শক্তি সম্বন্ধে জ্ঞান দান করে ।
৮। ঔষধের শক্তি পরিবর্তনের সাথে সাথে ঔষধের গুনগত পরিবর্তনের আলোক প্রদান করে ।
৯ । হোমিওপ্যাথিক দর্শন মানুষের নৈতিক উন্নতি সাধন করে ।
১০। রোগীর ও ঔষধের মধ্যে একটা যোগসূত্র আবিষ্কার করতে সাহায্য করে ।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতি দর্শনের কোন শ্রেণীভূক্ত:
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা দর্শনের শ্রেণী- ডাঃ হ্যানিম্যান দর্শনের কোন ধারণকেই একতরফা ভাবে গ্রহণ করেন নাই । তাহার নিকট জড় জগত ও অন্তর জগত উভয়ই সত্য ও বাস্তব। তাই তাকে সত্ত্বাবাদী দার্শনিক বলা হয়। সুতরাং তার প্রবর্তিত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা সত্ত্বাবাদী দর্শনের শ্রেণীভুক্ত ।
পরিবর্তিত মাত্রা কি? পরিবর্তিত মাত্রা প্রয়োগের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা কর:
পরিবর্তিত মাত্রা- ক্ষুদ্রতম একক মাত্রাকে আরও বিভক্ত, সূক্ষ্ম ও শক্তিশালী করাকে পরিবর্তিত মাত্রা বলে । এই পদ্ধতিতে চার আউন্সের একটি শিশির মধ্যে ৩/৪ অংশ সুরাসার মিশ্রিত পরিশ্রুত পানি নিতে হয় । এই পানির মধ্যে শক্তিকৃত ঔষধ সিক্ত একটি ১০ নং অনু বটিকা নিতে হয় । অনুবটিকাটি পানিতে দ্রবীভূত হলে উহাকে ১০ বার ঝাঁকি দিতে হয় । তারপর শিশি হতে ১ বা ২ চামচ ঔষধ একটি অর্ধেক পানি পূর্ণ গ্লাসে নিয়ে ভালমত মিশাইতে হয় । তারপর গ্লাস হতে রোগীকে ১ বা ২ চামচ ঔষধ খাওয়াতে হয়। গ্লাসের বাকী ঔষধ ফেলে দিতে হয় । রোগীকে প্রতি দিন এই ভাবে ঔষধ সেবন করাইতে হয়। প্রতিবার ঔষধ সেবনের পূর্বে শিশিটিকে ঝাঁকি দিয়ে তারপর উহা হতে ২ বা ১ চামচ ঔষধ গ্লাসের পানিতে নিতে হয় ।
পরিবর্তিত মাত্রার যৌক্তিকতা-
১। পরিবর্তিত মাত্রায় ভেষজ শক্তির সর্বোত্তম বিকাশ সাধন ঘটে ।
২। পরিবর্তিত মাত্রায় ঔষধজঃ বৃদ্ধি নাই বলিলেই চলে । ফলে যে সব রোগী দীর্ঘকাল অসুখে ভুগিয়া একেবারে দূর্বল হইয়া পড়িয়াছে তাদের মধ্যে কোন কোন রোগী এত বেশী অনুভূতি প্রবন যে, যে কোন শক্তির ঔষধ প্রয়োগ করিলে রোগের বৃদ্ধি ঘটে । সেই সব রোগীর ক্ষেত্রে নির্ভয়ে ব্যবহার করা চলে ।
৩। বার বার শক্তি ও মাত্রা পরিবর্তন হয় বলে রোগের ভোগকাল কমে এসে আরোগ্য ক্রিয়া দ্রুততর হয় । কোন কোন সময় অর্ধেক / চার ভাগের এক ভাগ বা তার চেয়েও কম ‘সময় লাগে ৷,
৪। ঘন ঘন প্রয়োগ করা যায় আবার পুনঃ প্রয়োগ জনিত কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় না ৷
ঔষধ পুনঃ প্রয়োগের জটিলতাগুলি কি কি:
পুনঃ প্রয়োগের উদ্দেশ্য হল উপশম ক্রিয়া দ্রুত করা এবং হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি কমিয়ে রোগীর কষ্ট লাঘব করা । পুনঃ প্রয়োগের শর্ত হল পূর্ববর্তী ঔষধটি সর্বতভাবে সদৃশ হতে হবে ফলে রোগীর মানসিক ও শারিরীক লক্ষণগুলি হ্রাস পেতে থাকবে এবং প্রতিবার ঔষধের শক্তি বৃদ্ধি ও মাত্রা আরো সূক্ষ্মতর হবে কিন্তু যদি ঔষধটি সদৃশ না হয় বা উহার শক্তি ও মাত্রা পরিবর্তন না করা হয় তাহলে নানা জটিলতার সৃষ্টি হয় । যেমন- কোন একটি শক্তির ঔষধ প্রথমবার প্রয়োগ করার পর জীবনীশক্তি তা বিনা শর্তে গ্রহণ করে এবং ঔষধটি জীবনী শক্তির উপর প্রত্যাশিত পরিবর্তন সাধন করে । কিন্তু বার বার একই শক্তির ঔষধ প্রয়োগ করিলে ঔষধ তার ক্ষমতার নির্দিষ্ট লক্ষণ গুলি খুঁজে পায় না। ফলে ঔষধের নিজস্ব লক্ষণ রোগীর অবশিষ্ট লক্ষণের সহিত মিলে নতুন কতগুলি লক্ষণ প্রকাশ করে, যা রোগীর প্রাথমিক লক্ষণের সদৃশ নয় এবং বার বার একই ঔষধ প্রয়োগের ফলে ঔষধের লক্ষণ গুলি স্থায়ী লক্ষণে পরিণত, হয় এবং একটি মিশ্র জটিল স্থায়ীরোগে পরিণত হয়ে রোগীর অবস্থা দিন দিন অবণতির দিকে নিতে থাকে ।
একক ঔষধ: হোমিওপ্যাথিক মৌলিক নীতিসমূহের মধ্যে অন্যতম হল- Simi, Mini এবং Mono. Simi=Similia Similibus Curentur Mini=Minimum Dose=সূক্ষ্মমাত্রা Mono=One/Single বা একক ঔষধ বিশুদ্ধ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাতে প্রতিবারে একটি ঔষধ প্রয়োগ করা হয়, কারণ ঔষধ প্রুভিংয়ের সময় একটি ঔষধই ব্যবহার করা হয় এবং তার সদৃশ লক্ষণ যখন কোন রোগীর মধ্যে দেখা দেয় তখন ঐ সদৃশ ঔষধ প্রয়োগ করিলে রোগী সুস্থ হয়ে যায়। কিন্তু তথাকথিত Dilution ঔষধ বা একাধিক ঔষধের মিশ্রণ যদি ব্যবহার করা হয় এবং তাতে যদি সাময়িক বা আংশিক কোন লক্ষণের উপশমও হয়, তাতে পরবর্তীতে উচ্চ শক্তির প্রয়োজন হলে ঔষধ নির্বাচন করা আর সম্ভব নয়, কারণ মিশ্রণটির কোন ঔষধ কাজ করেছে তা জানা সম্ভব নয় । কারণ ডাইলিউশন ঔষধ প্রুভিং হয় না, সুতরাং ডাইলিউশন ঔষধ দ্বারা আদর্শ আরোগ্য সম্ভব নয় এবং একটা গর্হিত কাজ ৷ হোমিওপ্যাথির আর একটি নীতি হল কম কষ্টে, কম সময়ে, কম খরচে রোগীকে সম্পূর্ণ আরোগ্য করা এবং তা একমাত্র একক ঔষধে সম্ভব !
হোমিও দর্শনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য:
ক) হোমিওপ্যাথিক দর্শনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হল হোমিওপ্যাথি যে একটি বিজ্ঞান ও কলা তা দর্শনের মাধ্যমে তুলে ধরা ।
খ) হোমিওপ্যাথি যে একটি প্রাকৃতিক আরোগ্য বিধান তা দর্শনের মাধ্যমে প্রমাণ করা ।
গ) প্রচলিত অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতির সাথে হোমিওপ্যাথির সম্পর্ক ও পার্থক্য নির্ণয় করা ৷
ঘ) হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতি যে, সবচেয়ে কম কষ্টের, কম সময়ের এবং কম খরচের (Least pain, least time, least cost) চিকিৎসা পদ্ধতি তার বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া । ঙ) বিতর্ক, সমালোচনা যাই থাক হোমিওপ্যাথিতে যে নির্দোষ আরোগ্য লাভ করা যায় তা দর্শনের মাধ্যমে তুলে ধরা ।
চ) হোমিওপ্যাথিতে রোগের নয়, রোগীর চিকিৎসা করতে হয়৷ দর্শনের মাধ্যমে তা তুলে ধরা ।
ছ) হোমিওপ্যাথিতে রোগীকে উপশম নয়, নির্মল / নির্দোষ আরোগ্য দান করা হয় এটা প্রমাণ করা ।
জ) সূক্ষ্ম ঔষধশক্তি মানবদেহে অস্থায়ী কৃত্রিম রোগ লক্ষণ সৃষ্টি করতে পারে, সুতরাং সূক্ষ্ম ঔষধ শক্তি প্রাকৃতিক রোগ শক্তিকে ধ্বংস করতে পারে তা দর্শনের আলোকে প্রকাশ করা।
ঝ) চিকিৎসা বিজ্ঞানের একমাত্র উদ্দেশ্য হল মানব দেহকে রোগমুক্ত করা এবং একমাত্র হোমিওপ্যাথিই পারে মানুষকে নির্দোষ আরোগ্য দান করতে, তা দর্শনের মাধ্যমে তুলে ধরা।
ঔষধ পুনঃপ্রয়োগ নীতি আলোচনা কর:
ঔষধের পুনঃপ্রয়োগ প্ৰণালী
ক) পুনঃ প্রয়োগ আবশ্যক হইলে শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে করিতে হইবে এবং উহা পরিবর্তিত মাত্রায় ।
খ). নির্বাচিত ঔষধকে পরিশ্রুত পানিতে মিশ্রিত করিয়া শিশিকে ৮/১০/১২ বার ঝাঁকি দিয়া উচ্চতর নবশক্তিতে পরিণত করিয়া রোগীকে এক বা একাধিক চা-চামচ মাত্রা সেবন করাইতে হবে ।
গ) দীর্ঘদিন পূরাতন রোগে প্রতিদিন বা একদিন পর পর, নূতন রোগে দুই হইতে ছয় ঘন্টা পর পর এবং তীব্র সাংঘাতিক রোগের ক্ষেত্রে প্রতি ঘন্টায় বা আরো ঘন ঘন প্রয়োগ করিতে হইবে ।
ঘ) ঔষধ মিশ্রিত শিশিটি যদি শেষ হয়ে যায় এবং ঔষধের লক্ষণ যদি তখনও রোগীর মধ্যে বর্তমান থাকে তা হইলে সেই ঔষধের পূর্বপেক্ষা উচ্চতর শক্তির একটি বা কয়েকটি অনুবটিকা লইয়া পরিবর্তিত মাত্রায় প্রয়োগ করিতে হইবে ৷
ঙ) রোগীর অবস্থায় ক্রমোন্নতি অব্যাহত থাকিলে এবং জীবনে কখনও ভোগ করে নাই বা অনুভূত হয় নাই এমন কোন লক্ষণ দেখা না দিলে এই ভাবেই ঔষধ প্রয়োগ, করিতে হইবে ৷
চ) যদি নূতন, কোন লক্ষণ রোগীতে দেখা দেয় তবে
রূপান্তরিত লক্ষণ সমষ্টির সহিত রোগের বাদ বাকী লক্ষণ মিলিয়া একটি পরিবর্তিত অবস্থা প্রকাশিত হয় এবং এই অবস্থায় পূর্বের নির্বাচিত ঔষধের পরিবর্তে অন্য একটি অধিকতর সদৃশ ঔষধ নির্বাচন করিতে হইবে ।
ছ) হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি দেখা দিলে তখন ঔষধের মাত্রা আরো সূক্ষ্ম করিতে হইবে এবং দীর্ঘদিন পর পর প্রয়োগ করিতে হইবে ৷
ডাঃ হ্যানিম্যানের চিকিৎসা দর্শন বর্ণনা কর :ডাঃ হ্যানিম্যানের চিকিৎসা দর্শন হ্যানিম্যান ছিলেন একজন প্রকৃত চিকিৎসা বিজ্ঞানী । কোন প্রদ্ধতি বা ধারণাকে তিনি এক তরফাভাবে গ্রহণ করতে পারেন নি । তার চিকিৎসা দর্শন এলোপ্যাথি, আয়ূর্বেদী, ইউনানী প্রভৃতি চিকিৎসা দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি তার চিকিৎসা শাস্ত্রের নাম রাখলেন “হোমিওপ্যাথিক” । ইহা একটি যুক্তিসংগত চিকিৎসা কলা (Rational Healing Art) ডাঃ হ্যানিম্যানের চিকিৎসা দর্শনের মূলতত্ত্বগুলি নিম্নরূপ ৷
। মানবদেহে জড় পদার্থ হলেও এটা একটা জীবন্ত সচেতন সত্ত্বা। রোগ অজড়, অশুভ প্রাকৃতিক শক্তি। জড়দেহ ও জীবনীশক্তি একত্রে মিশ্রিত হয়ে একটা সম্পূর্ণ একক সত্ত্বা জীবন গঠন করে ।
২। প্রাকৃতিক শক্তি বা রোগ দেহে নয় জীবনী শক্তিকে আক্রমণ করে । তার ফলেই দৈহিক ও মানসিক বিকৃত লক্ষণ প্রকাশ পায় ।
৩। রোগীর দৈহিক ও মানসিক বিকৃতির লক্ষণগুলি যদি ঔষধের লক্ষণ সমষ্টির সদৃশ হয় তবেই প্রকৃত আরোগ্য সাধিত হয় (similia, similibus, curentur) .
৪। রোগশক্তি একটি সুক্ষ্মশক্তি – সুতরাং ঔষধের শক্তিও সূক্ষ্মশক্তি বা Potentized হতে হবে ।
৫। রোগীর শারিরীক ও মানসিক লক্ষণ সমষ্টি শুধুমাত্র একটি ঔষধের লক্ষণ সমষ্টির সদৃশ্য হয়, সুতরাং একবারে : একটিমাত্র ঔষধ প্রয়োগ করিতে হইবে ।
৬। রোগ নয়, রোগীকে চিকিৎসা করিতে হইবে। রোগীর স্বতন্ত্র রোগ চিত্রানুসারে ঔষধ নির্বাচন করিতে হইবে, রোগের নামে
নয় ৷
৭। যে ঔষধ সুস্থ্য দেহে রোগ উৎপাদন করতে পারে সেই ঔষধ প্রাকৃতিক পীড়াও আরোগ্য করিতে পারে। সুতরাং ঔষধ অবশ্যই সুস্থ্যদেহে প্রুভিং করিতে হইবে ।
৮। রোগীকে আংশিকভাবে নয়, সামগ্রিভাবে চিকিৎসা করিতে হইবে- কারণ রোগের আক্রমণে জীবনী শক্তি তথা অধিকারী মানুষটির দৈহিক ও মানসিক বিকৃতি ঘটে ।
৯। এনাটমি, ফিজিওলজি ও প্যাথলজি সাহায্যকারী চিকিৎসা বিজ্ঞান । এর উপর অধিক নির্ভরশীল না হয়ে রোগীর দৈহিক ও মানসিক লক্ষণের সদৃশ লক্ষণ সৃষ্টিকারী ঔষধের উপর নির্ভরশীল হতে হবে ।
ডাঃ হ্যানিম্যানকে সত্যাবাদী- দার্শনিক বলা হয় কেন?:
হ্যানিম্যান ছিলেন একজন প্রকৃত বৈজ্ঞানিক ফলে কোন পদ্ধতি বা ধারণাকে এক তরফাভাবে তিনি গ্রহণ করেননি । তাই দর্শনে হ্যানিম্যান একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করিয়া আছেন তাহার নিকট জড় জগৎ ও অন্তর জগৎ উভয়ই সত্য এবং বাস্তব। জড়বাদীদের মতন তিনি ঈশ্বরকে অবিশ্বাস করেন নাই, আবার ভাববাদীদের মতন মনের মধ্যে ব্যতীত বাহিরের বস্তু অস্তিত্বে অস্বীকার করেন নাই । বিনা বিচারে, বিনা পরীক্ষায়, বিনা প্রমাণে কোন কিছু গ্রহণ করা তাহার স্বভাবে ছিল না। তিনি জীবনী শক্তিকে অদৃশ্য, গতিশীল ও ঐশ্বরিক শক্তি বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন । রোগ নির্ণয়ে তিনি দেহ, মন, অনুভূতি, মেজাজ, স্বভাব-চরিত্র প্রভৃতির অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়া না আসা পর্যন্ত তাহাকে আরোগ্য বলিয়া স্বীকার করেন নাই । তিনি -প্রাণ, মন, জীবনীশক্তি সবকিছুরই সত্ত্বায় বিশ্বাস করতেন। সুতরাং তাকে প্রাণবাদী বলা যায় ৷ দর্শনে প্রাণবাদের পরিবর্তিত ও রূপান্তরিত নাম সত্ত্বাবাদ । এই হিসাবে হ্যানিম্যানকে সত্ত্বাবাদী দার্শনিক বলা যেতে পারে ।
একাধিক ঔষধ একত্রে ব্যবহারের বিরুদ্ধে ডাঃ হ্যানিম্যানের দার্শনিক ব্যখ্যা উল্লেখ কর:
একাধিক ঔষধ একত্রে ব্যবহারের বিরুদ্ধে ডাঃ হ্যানিম্যানের দার্শনিক ব্যখ্যা হল
১। প্রুভিং এর সময় কখনও দুইটি ঔষধ মিশ্রিত করিয়া প্রুভিং করা হয় নাই । কাজেই মিশ্র ঔষধ দ্বারা কি রোগ বা লক্ষণ সমষ্টি সৃষ্টি হবে সে সম্বন্ধে সবাই অজ্ঞাত ।
২। অসুস্থ্য দেহে একাধিক ঔষধ প্রয়োগ করিলে ঔষধ গুলির শক্তি ও রোগশক্তির তুমুল আলোড়নের ফলে অসুস্থ্য জীবনীশক্তি আরো অসুস্থ্য হইয়া পড়িবে, এমনকি রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটিতে পারে ।
৩। প্রয়োগকৃত একক ঔষধ নির্বাচনে ভুল হলে এবং কোন জটিলতা দেখা দিলে এন্টিডোট ঔষধ দ্বারা তা প্রতিকার করা যায় । কিন্তু মিশ্র ঔষধের কোন ঔষধটি জটিলতা সৃষ্টি করল তা নির্ণয় করা যায়না- ফলে কোন প্রতিকারও সম্ভব নয় ।
“ডাঃ হ্যানিমান একজন ভাববাদী দার্শনিক’-আলোচনা কর:
ভাববাদ হলো দর্শনের একটা শাখা । ভাববাদ বা Idealism হল বাস্তবতা । যে সব ধারণা দর্শন দ্বারা প্রমাণ করা যায় বা তার ফলাফল বাস্তব ঘটনা দ্বারা প্রত্যক্ষ করা যায় তাহাই ভাববাদ । · যেমন সূক্ষ্ম ঔষধশক্তি সদৃশ রোগ শক্তিকে ধ্বংস করে । তার বাস্তব ফলাফলে দেখতে পাই রোগীর দৈহিক ও মানসিক বিকৃতিগুলি চলে গিয়ে রোগী আগের মত স্বাভাবিক জীবন যাপন করে । ডাঃ হ্যানিম্যানের চিকিৎসা দর্শনের মূলতত্ত্বগুলি নিম্নরূপ
১ । মানবদেহে জড় পদার্থ হলেও এটা একটা জীবন্ত সচেতন সত্ত্বা । রোগ অজড়, অশুভ প্রাকৃতিক শক্তি । জড়দেহ ও জীবনীশক্তি একত্রে মিশ্রিত হয়ে একটা সম্পূর্ণ একক সত্ত্বা জীবন গঠন করে ।
২। প্রাকৃতিক শক্তি বা রোগ দেহে নয় জীবনী শক্তিকে আক্রমণ করে। তার ফলেই দৈহিক ও মানসিক বিকৃত
লক্ষণ প্রকাশ পায় ৷
৩। রোগীর দৈহিক ও মানসিক বিকৃতির লক্ষণগুলি যদি ঔষধের লক্ষণ সমষ্টির সদৃশ হয় তবেই প্রকৃত আরোগ্য সার্ধিত হয় (similia, similibus, curentur )
৪। রোগশক্তি একটি সুক্ষ্মশক্তি – সুতরাং ঔষধের শক্তিও সূক্ষ্মশক্তি বা Potentized হতে হবে ।
৫ । রোগীর শারিরীক ও মানসিক লক্ষণ সমষ্টি শুধুমাত্র একটি ঔষধের লক্ষণ সমষ্টির সদৃশ্য হয়, সুতরাং একবারে একটিমাত্র ঔষধ প্রয়োগ করিতে হইবে ।
৬। রোগ নয়, রোগীকে চিকিৎসা করিতে হইবে। রোগীর স্বতন্ত্র রোগ চিত্রানুসারে ঔষধ নির্বাচন করিতে হইবে, রোগের নামে নয় ৷
৭। যে ঔষধ সুস্থ্য দেহে রোগ উৎপাদন করতে পারে সেই ঔষধ প্রাকৃতিক পীড়াও আরোগ্য করিতে পারে । সুতরাং ঔষধ অবশ্যই সুস্থ্যদেহে প্রুভিং করিতে হইবে ।
৮। রোগীকে আংশিকভাবে নয়, সামগ্রিভাবে চিকিৎসা করিতে হইবে- কারণ রোগের আক্রমণে জীবনী শক্তি তথা অধিকারী মানুষটির দৈহিক ও মানসিক বিকৃতি ঘটে ।
৯ । এনাটমি, ফিজিওলজি ও প্যাথলজি সাহায্যকারী চিকিৎসা বিজ্ঞান। এর উপর অধিক নির্ভরশীল না হয়ে রোগীর দৈহিক ও মানসিক লক্ষণের সদৃশ লক্ষণ সৃষ্টিকারী ঔষধের উপর নির্ভরশীল হতে হবে ।
প্রাণবাদের (Vitalism) দৃষ্টিকোণ হইতে ডাঃ হ্যানিম্যানের কার্য: প্রাণবাদ— মানুষ যখন সুস্থ্য থাকে তখন জীবণীশক্তি তার ক্ষুধা, নিদ্রা, বিশ্রাম, দেহের ক্ষয় পূরণ ও বৃদ্ধি সাধন করে । আর যখন অসুস্থ্য থাকে তখন অতিরিক্ত কাজ হিসাবে বিভিন্ন শারিরীক ও মানসিক লক্ষণ প্রকাশ করিয়া বাহিরের শক্তির সাহায্য প্রার্থনা করে ।
পাস্তুর (Pasteur), টিনডাল (Tyndal) প্রমুখ বৈজ্ঞানিকগণ প্রমাণ করিয়াছেন যে, জড় থেকে জীবনের উৎপত্তি হয় না। যেমন মানুষের বেলায় জীবন বা প্রাণের সৃষ্টি হয় Ovum এবং Sperm থেকে, যারা অজড় বা জীবনধারী বা প্রাণধারী । এই প্রাণশক্তির বলেই জীবন আত্মসংরক্ষণ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মবিকাশ ও বংশবৃদ্ধি করে থাকে ।
হ্যানিম্যান প্রাণ, মন, জীবনীশক্তি সবকিছুর সত্তায় বিশ্বাস করতেন। তাই তাকে প্রাণবাদী (Vitalist) . বলা যায়। দর্শনে ও রূপান্তরিত নাম সত্ত্বাবাদ প্রাণবাদের পরিবর্তিত (Substantialism)। হ্যানিম্যান দর্শনের সকল শাখাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে যে চিকিৎসা দর্শন আবিষ্কার করেন তার নাম দেন “হোমিওপ্যাথি” বা Rational Healing Art বা যুক্তিসঙ্গত চিকিৎসা কলা । তিনি বললেন, মানবদেহের ‘ অভ্যন্তরে ‘এক অজড়, অমূর্ত, আত্মিক জীবনীশক্তি বিরাজমান । দেহ নয় এই জীবনীশক্তিই প্রাকৃতিক ব্যাধির আক্রমণের লক্ষ্যস্থল । ব্যাধির অশুভ প্রভাবে এই জীবনীশক্তিই অসুস্থ হয় । দৈহিক ও মানসিক বিকৃত লক্ষণগুলি তারই বিপদ সংকেত ।
জীবনীশক্তির বিশৃঙ্খলাই রোগ: দেহ যন্ত্রের স্বাভাবিক ক্রিয়া বা অনুভূতির যখন বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয় তখন কতগুলি বিকৃত দৈহিক ও মানসিক লক্ষণের সৃষ্টি হয়, এই লক্ষণ সমষ্টিকেই তথাকথিত একটি রোগ নামে অভিহিত করা হয় । সূক্ষ্ম রোগশক্তির আক্রমণে যখন সূক্ষ্ম জীবনীশক্তি পরাজিত হয়, তখন জীবনীশক্তির স্বাভাবিক কাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। এই বিশৃঙ্খলাগুলিকে জীবনীশক্তি কতগুলি শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ দ্বারা প্রকাশ করে বাহিরের সাহায্য কামনা করে । সুতরাং জীবনীশক্তির বিশৃঙ্খলাই রোগ ।
রোগশক্তি: যে অদৃশ্য ও অশুভশক্তি জীবনীশক্তিকে পরাজিত করিয়া দেহে প্রভাব বিস্তার করিয়া দৈহিক ও মানসিক বিকৃতি ঘটায় তাহাই রোগ শক্তি ।
রোগশক্তি বিনাবাধায় দেহে তার অশুভক্রিয়া প্রকাশ করিতে পারে না, প্রথমে জীবনী শক্তিকে পরাজিত করিতে হয়। যদি জীবনীশক্তি রোগ শক্তি অপেক্ষা শক্তিশালী হয় তাহলে রোগশক্তি দেহে কোন রোগ সৃষ্টি করতে পারে না, তবে রোগশক্তির’ ক্রিয়া স্থায়ী ।
ঔষধশক্তি: কোনরূপ পূর্বশত ছাড়াই দেহে প্রভাব বিস্তার করে। সুস্থ্যদেহে ঔষধ প্রয়োগ করিলে দেহে কৃত্রিম রোগের সৃষ্টি হয়, আবার অসুস্থ্য দেহে সদৃশ ঔষধ প্রয়োগ করিলে . ঔষধশক্তি রোগশক্তিকে ধ্বংস করে দেয় । তবে ঔষধশক্তির ক্রিয়া ক্ষণস্থায়ী।
রোগের পরিপোষক কারণ: যে সব কারণের জন্য রোগ দেহে পরিপুষ্ট হতে থাকে এবং আরোগ্যের পথে বাধা সৃষ্টি করে সেই সব কারণকে পরিপোষক কারণ বলে । যেমন অজীর্ণের রোগী গুরুপাক খাবার খেলে পেটের পীড়ার বৃদ্ধি হয় অথচ রোগী গুরুপাক খাবার খেতেই থাকে । এখানে গুরুপাক খাবার পরিপোষক কারণ ।
রোগের উত্তেজক কারণ :
যে সব কারণের জন্য রোগের আক্রমণের সূচনা হয় তাকেই উত্তেজকা কারণ বলে । যেমন বৃষ্টিতে ভিজিয়া ঠান্ডা লাগার দরুণ সর্দি- জ্বর-কাশির সূচনা । এখানে বৃষ্টিতে ভেজা একটি উত্তেজক কারণ ।
রোগশক্তি কি? রোগশক্তি ও ঔষধশক্তির ক্রিয়ার পার্থক্য কি ?
রোগশক্তি— যে অদৃশ্য, অশুভশক্তি জীবনীশক্তিকে আক্রমন ও পরাজিত করিয়া দেহে প্রভাব বিস্তার করিয়া দৈহিক ও মানসিক বিকৃতি ঘটায় তাহাই রোগশক্তি ।
রোগশক্তি ঔষধশক্তির পার্থক্য
রোগশক্তি | ঔষধশক্তি |
রোগ শক্তি বিনা বাধায় দেহে প্রবেশ করিতে পারে না, তাকে জীবনশক্তিকে পরাজিত করতে হয় । | ঔষধ শক্তি কোন পূর্ব শর্ত ছাড়া দেহে প্রবেশ ও ক্রিয়া করতে পারে। |
রোগশক্তি অশুভ শক্তি । | ঔষধ শক্তি শুভ শক্তি । |
রোগ শক্তিকে বাড়ান বা কমান যায় না । | প্রয়োজনে ঔষধের শক্তিকে বাড়ান বা কমান যায় ৷ |
ইহার ক্রিয়াকাল স্থায়ী । | ইহার ক্রিয়াকাল অস্থায়ী । |
রোগশক্তি দেহে শুধু রোগ উৎপাদন করিতে পারে । | ঔষধশক্তি দেহে রোগ উৎপাদন ও রোগ নিরাময় করিতে পারে । |
রোগ প্রবণতা কিভাবে ধ্বংস হয়ে যায় :
রোগ প্রবণতার ধ্বংস- রোগীর অর্পিত বা ধাতুগত বা বংশগত রোগ
প্রবণতা সদৃশ বিধান মতে চিকিৎসা করিলে ঐ প্রবণতা ধ্বংস হয় ৷ রোগীর অর্জিত রোগ প্রবণতা যেমন যৌন রোগ, মাদক সেবন, রাত্রি জাগরণ, অলস জীবন যাপন, অতিরিক্ত অসদৃশ ঔষধ গ্রহণ, পরিবেশ, অনৈতিক ক্রিয়াকর্ম, ইত্যাদি প্রথমে বর্জন করিতে হবে তারপর সদৃশ বিধান মতে রোগের চিকিৎসা করিলে নির্দোষভাবে রোগমুক্তি হবে ।
অনাক্রমণ্যতা বলিতে কি বুঝ? রোগের চেয়ে ঔষধ শক্তিশালী ব্যখ্যা কর ।
অনাক্রমন্যতা (Immunity)
যে ক্ষমতাবলে দেহ নিজেকে
রোগ আক্রমন থেকে মুক্ত রাখে এবং কোন কোন সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলে তাকে অনাক্রামন্যতা বলে । ইহা জীবনীশক্তির সবল অবস্থা এবং রোগ প্রবণতা সৃষ্টিকারী মায়াজমের প্রভাব নষ্ট করে দেয় ।
প্রতিক্রিয়া কাকে বলে? রোগ প্রবণতা দূর করার উপায় কি?:
প্রতিক্রিয়া- নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুসারে “প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে ।
সুস্থ্যদেহে কোন ঔষধ প্রয়োগ করিলে (ঔষধ প্রুভিং এর সময়) ঔষধ তার শক্তিবলে দেহে রোগ সৃষ্টি করে । এই রোগ সৃষ্টি করা হল ঔষধের ক্রিয়া । ঔষধের ক্রিয়ার ফলে দৈহিক ও মানসিক বিকৃতি ঘটে । এই দৈহিক ও মানসিক বিকৃতিগুলি জীবনী শক্তি বাহিরের সাহায্যের আশায় প্রকাশ করে। বাহিরে প্রকাশ করাটাই হল জীবনীশক্তির প্রতিক্রিয়া ।
দেহে যখন কোন প্রাকৃতিক রোগ প্রবেশ করে তখন জীবনীশক্তি তাকে বাধা দেয়, জীবনী শক্তি যখন পরাস্ত হয় তখন কতগুলি লক্ষণ প্রকাশ করে প্রতিক্রিয়া জানায় । অসুস্থ্য দেহে যখন ঔষধ প্রয়োগ করা হয় তখন রোগ শক্তিকে ধ্বংস করিতে রোগশক্তির সমপরিমাণের চেয়ে কিছু বেশী ঔষধশক্তির প্রয়োজন হয় । ঔষধের অতিরিক্ত শক্তি তখণ জীবনীশক্তিকে আক্রমণ করে । জীবনীশক্তি তখন প্রতিক্রিয়ায় রোগ লক্ষণের বৃদ্ধি ঘটায় ।
রোগ প্রবণতা দূর করার উপায়- অর্পিত বা বংশগত রোগ প্রবণতা দূর করার উপায় হলো রোগীর দৈহিক ও মানসিক লক্ষণের সদৃশ্য স্থায়ী চিররোগ উপবিষ তথা মায়াজমেটিক গ্রুপের কোন ঔষধ সেবন করা যা রোগ প্রবণতা সৃষ্টিকারী মায়াজমের ধ্বংস সাধন করে ।
অর্জিত রোগ প্রবণতা দূর করার উপায় হল যে কারণে রোগ প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে তা দূর করা। যেমন- অনৈতিক জীবনযাত্রার প্রণালী, অনৈতিক যৌন জীবন, মাদকদ্রব্য সেবন, অতিরিক্ত শারিরীক ও মানসিক পরিশ্রম ইত্যাদি হইতে দূরে সরে আসা ।
হোমিওপ্যাথিক রোগ বৃদ্ধির স্বরূপ বিশ্লেষণ কর:
রোগশক্তিকে ধ্বংস করিতে রোগশক্তির সমপরিমাণের চেয়ে কিছু বেশী ঔষধশক্তির প্রয়োজন হয়। ঔষধশক্তি যদি রোগশক্তির চেয়ে অনেক বেশী হয় তাহলে ঔষধের অবশিষ্ট শক্তি জীবনীশক্তিকে আক্রমণ করে । প্রতিক্রিয়া স্বরূপ জীবনীশক্তি রোগ লক্ষণ বৃদ্ধি করে। এই বৃদ্ধিকে হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি বা মঙ্গলজনক বৃদ্ধি বলে । ঔষধের শক্তি যত বেশী হবে হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধিও তত বেশী হবে ।
চিররোগের চিকিৎসায় কিকি অনুসন্ধান করা আবশ্যক?:
চিররোগের চিকিৎসায় নিম্নোক্ত কারণগুলি অনুসন্ধান করিতে হবে ।
১। উদ্দীপক কারণ
২ । পরিপোষক কারণ
৩। প্রধান কারণ
উদ্দীপক কারণ- পীড়া আরোগ্য কল্পে প্রথমেই কোন উদ্দীপক কারণ যদি থাকে তা নির্ণয় করে অপসারণ করতে হবে। যেমন লেখাপড়া বেশী করলে মাথা ব্যথা বৃদ্ধি এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের বেশী পড়াশুনা পরিহার করতে হবে ।
পরিপোষক কারণ- যদি কোন পরিপোষক কারণ থাকে তা অনুসন্ধান করে দূর করতে হবে, অন্যথায় পরিপোষক কারণ আরোগ্যের পথে বাধা সৃষ্টি করবে। যেমন যক্ষ্মা রোগীকে স্যাঁতস্যাতে স্থান হতে স্বাস্থ্যসম্মত স্থানে বসবাস করতে হবে ।
সর্বশেষ পীড়ার প্রধান কারণ নির্ণয় করতে হবে। এই লক্ষে অনুসন্ধান করিতে হইবে শারিরীক ও মানসিক লক্ষণ, নৈতিক চরিত্র, যৌন জীবন, পেশা, বাসস্থান, ধাতুপ্রকৃতি, অভ্যাস, সামাজিক/ অর্থনৈতিক/ রাজনৈতিক/ শিক্ষাগত অবস্থান, বয়স, পূর্বপুরুষদের বংশগত ইতিহাস ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে জানা গেলে আরোগ্যের পথ সহজ হবে ।
পীড়ার হ্রাস বা উপশম- রোগীর শারিরীক ও মানসিক লক্ষণের সদৃশ কোন শক্তিকৃত ঔষধ প্রয়োগ করার পর যদি দেখা যায় রোগীর প্রাথমিক লক্ষণগুলি হ্রাসপ্রাপ্ত হইতেছে বা রোগীর অধিকতর শান্তভাব, স্ফুর্তি, প্রফুল্লতা ও প্রসন্নতা প্রভৃতি স্বাভাবিক অবস্থার প্রত্যাবর্তন দেখা যায় তাহলে তাকে পীড়ার হ্রাস বলা হয় ।
পীড়ার বৃদ্ধি— শক্তিকৃত ঔষধ সেবন করার পর যদি দেখা যায় নুতন কোন লক্ষণ প্রাথমিক লক্ষণের সহিত একত্রিত হইয়া রোগীর লক্ষণসমূহ বৃদ্ধি পাইতেছে বা রোগীর অশান্তি ইত্যাদি বৃদ্ধি পাইয়াছে, তবে উহার পীড়ার বৃদ্ধি বলে ।
রোগ কি? রোগের চেয়ে ঔষধ শক্তিশালী- ব্যখ্যা কর ।
রোগ- জীবনীশক্তির বিশৃঙ্খলা অবস্থাকে রোগ বলে ।
রোগশক্তি থেকে ঔষধশক্তি বেশী শক্তিশালী কারণ রোগশক্তি, বিনাবাধায় দেহে কোন প্রভাব বিস্তার করিতে পারে না- তাকে জীবনী শক্তিকে পরাজিত করিতে হয় এবং রোগ শক্তির সীমা নির্দিষ্ট একে বাড়ান কমান যায় না । পক্ষান্তরে ঔষধশক্তি কোনরূপ পূর্ব শর্ত ছাড়াই দেহে প্রভাব বিস্তার করিতে পারে । সুস্থ্য বা অসুস্থ্য দেহে ঔষধের কোন একটি শক্তি – কাজ না করিলে ঔষধের শক্তিবৃদ্ধি করা যায় । সুতরাং রোগের চেয়ে ঔষধ শক্তিশালী ।
রোগ প্রতিরোধ ও রোগ প্রবণতার/সংবেদনশীলতা মধ্যে পার্থক্য কি ?:
রোগ প্রবণতা(Susceptibility) | রোগ প্রতিরোধ (Immunity) |
কোন ধাতুগত দোষ বা অবস্থা কোন উত্তেজক কারণের অভাবে বিকশিত না হইয়া সুপ্ত অবস্থায় থাকিয়া যাওয়াকে রোগ প্রবণতা বলে । | দেহকে রোগ আক্রমণ থেকে মুক্ত রাখা এবং বিশেষ বিশেষ রোগ প্রতিরোধের শক্তিকে রোগ রোগ প্রতিরোধ বলে । |
ইহা দ্বারা দেহতন্ত্রের কোন কিছুর অভাব বা চাহিদা সূচিত হয় ৷ | ইহা দ্বারা রোগ প্রবণতা সৃষ্টিকারী মায়াজমের ধ্বংস সাধন সূচিত হয় । |
ইহা দেহে রোগ সৃষ্টির সুযোগ করে দেয়। | ইহা দেহকে রোগ আক্রমণ থেকে রক্ষা করে । |
ইহা জীবনীশক্তির দুর্বল অবস্থা | ইহা জীবনীশক্তির সবল অবস্থা |
সদৃশ চিকিৎসা দ্বারা রোগ প্রবণতা কমে যায় ৷ | সদৃশ চিকিৎসা দ্বারা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় । |
রোগ ও ঔষধ সম্বন্ধে হোমিওপ্যাথিক ধারণা কি ?:
রোগ- যে অদৃশ্য অশুভ প্রাকৃতিক শক্তির প্রভাবে জীবনীশক্তির স্বাভাবিক কার্যক্রমের বিকৃতি ঘটে তাহাই রোগ ।
ঔষধ— ইহা এমন একটি শক্তি যা জীবনীশক্তির স্বাভাবিক গতিধারাকে অস্বাভাবিক ধারায় এবং অস্বাভাবিক ধারাকে স্বাভাবিক ধারায় পরিবর্তন করে । অর্থাৎ যে ভেষজের সুস্থ্যদেহে রোগ উৎপাদন করার শক্তি আছে এবং অসুস্থ্য দেহকে সুস্থ্য করার শক্তি আছে তাহাই হোওিপ্যাথিক ঔষধ ।
রোগের উত্তেজক কারণ সম্বন্ধে আলোচনা কর:
যে সেব কারণের জন্য রোগের আক্রমণ সূচিত হয় উহাদিগকে উত্তেজক বা উদ্দীপক কারণ বলে । যেমন গাড়ীতে চড়িলে বমি, রোদ্রে হাঁটিলে মাথাব্যথা ইত্যাদি উত্তেজক কারণ ।
কিভাবে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস/রোগ প্রবণতা বৃদ্ধি পায় ব্যখ্যা কর :
রোগশক্তি সকল ক্ষেত্রে এবং সকল সময়ে রোগ উৎপাদন করিতে পারে না । রোগ প্রবণতাই রোগের মূল কারণ । এই রোগ প্রবণতা নির্ভর করে ব্যক্তি মানুষের জীবন-যাপন প্রণালী, বংশগত ধারা, পরিবেশ ও পরিস্থিতি, শোক, অনাহার, অনিদ্রা, পাপাচার ইত্যাদির উপর । মানুষ যখন অন্যায়, অত্যাচার, ব্যাভিচার, হত্যা, ঘুষ গ্রহণ ইত্যাদি অনৈতিক কাজে জুড়িয়ে পড়ে তার মধ্যে তখন অনুশোচনা জাগে, ভয় বাসা বাঁধে এবং তার ফলে তার জীবনীশক্তি দুর্বল হয়ে রোগ প্রবণতা বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে । ইহা ছাড়াও অতিরিক্ত ঔষধ সেবন, নানা প্রকার এন্টিবায়োটিক ও এন্টিসেপটিক ব্যবহার. উত্তেজক দ্রব্য যথা এলকোহল, আফিম সেবন, সালফার, পারদ, আর্সেনিক প্রভৃতি ভেষজের অপব্যবহারের ফলে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায় ।
ঔষধজনিত বৃদ্ধি সম্বন্ধে আলোচনা কর :
সদৃশ বিধানমতে সুনির্বাচিত” ঔষধটির শক্তি যখন রোগ শক্তির চেয়ে শক্তিশালী হয় তখন ঔষধশক্তি’ ‘রোগ শক্তিকে ধ্বংস করে। রোগশক্তিকে ধ্বংস করিতে রোগশক্তির সমপরিমাণের চেয়ে সামান্য কিছু বেশী ঔষধশক্তি ব্যয়িত হয়। ঔষধশক্তির অবশিষ্ট শক্তি তখন জীবনীশক্তিকে আক্রমণ করে। জীবনী শক্তি তখন তার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করায় রোগ লক্ষণের সাময়িক বৃদ্ধি ঘটে । ইহাই ঔষধজনিত বৃদ্ধি । এই বৃদ্ধির পর রোগী সম্পুর্ণ আরোগ্য লাভ করে। এই বৃদ্ধি অত্যন্ত সুলক্ষণ, এই বৃদ্ধির লক্ষণে ঔষধ প্রয়োগ করা উচিত নয় ।
রোগ দ্বারা কে আক্রান্ত হয়— জীবনী শক্তি অথবা দেহ:
যে . স্বয়ংক্রিয় অদৃশ্যশক্তি জীবদেহকে নিয়ন্ত্রণ করে তাহাই জীবনীশক্তি । সুস্থ্য অবস্থায় জীবনীশক্তি ‘ দেহের সকল স্বাভাবিক কাজ সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, যেমন, আহার, নিদ্রা, পরিপাক, ইচ্ছা/ অনিচ্ছা, জৈবিক চাহিদা ইত্যাদি । দেহে কোন রোগ জীবাণু প্রবেশ করিলে জীবনীশক্তি রোগ শক্তি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল । কিন্তু জীবনীশক্তি পরাজিত হলে দেহ টেরও পায় যে সে আক্রান্ত এবং জীবনী শক্তি নানা রকম শারিরীক ও মানসিক লক্ষণ প্রকাশ করিয়া বাহিরের সাহায্য চায় । বাহির হতে ঔষধ প্রয়োগ করিলে ঔষধশক্তি রোগশক্তিকে ধ্বংস করে দেয়, জীবনীশক্তি তখন রোগমুক্ত হয়ে স্বাভাবিক কাজে ফিরে যায়। ঘরে ডাকাত ঢুকিলে গৃহকর্তাকে আক্রমন করে, ঘর বা আসবাবপত্র আক্রমন করে না। সুতরাং ঘরসদৃশ দেহ রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয় না, আক্রান্ত হয় জীবনীশক্তি ।
সংবেদনশীলতা কাকে বলে? ব্যখ্যা কর:
সংবেদনশীলতা (susceptibility) বা রোগ প্রবণতা— কোন ধাতুগত দোষ বা অবস্থা কোন উত্তেজক কারণের অভাবে বিকশিত না হইয়া সুপ্ত অবস্থায় থাকিয়া যাওয়াকে রোগ প্রবণতা বা সংবেদনশীলতা বলে । ইহা দ্বারা দেহতন্ত্রের কোন কিছুর অভাব বা চাহিদা সূচিত হয়। ইহা দেহের রোগ সৃষ্টির সুযোগ করে দেয় । ইহা জীবনীশক্তির দূর্বল অবস্থা । উত্তেজক কারণের অনুকুল পরিবেশে বিকৃত সংবেদনশীলতার পরিতৃপ্তি ঘটে, ফলে রোগ উৎপন্ন হয় । আবার সুনির্বাচিত হোমিওপ্যাথিক ঔষধ প্রতিটি রোগীর ব্যক্তিত্ব অনুসারে সূক্ষ্মমাত্রায় জিভের উপর প্রয়োগ করিলেই বিকৃত সংবেদনশীলতা পরিতুষ্ট হয়। দেহের প্রয়োজন মিটে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি হয় ।
জীবনীশক্তি, শরীর ও রোগের মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয় কর:
জীবনীশক্তি— যে স্বয়ংক্রিয় অদৃশ্য শক্তি সুস্থ্য অবস্থায় দেহের
সকল স্বাভাবিক কাজ সুশৃঙ্ক্ষলভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, যেমন-আহার, নিদ্রা, পরিপাক, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, জৈবিক চাহিদা ইত্যাদি এবং দেহে কোন রোগ জীবাণু প্রবেশ করিলে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে, তাহাই জীবনীশক্তি। জীবনীশক্তি পরাজিত হলে নানা শারীরিক ও মানুষিক লক্ষণ প্রকাশ করিয়া রোগশক্তির বিরুদ্ধে বাহিরের সাহায্য কামনা করে ।
শরীর বা দেহ হল একটি জড় বস্তু, আর এই জড় দেহের নিয়ন্ত্রক হল জীবনীশক্তি যা একটি অজড়শক্তি। দেহ হল একটি ঘর আর জীবনীশক্তি এর মালিক । ঘরের হেফাজত করা যেমন ঘরের মালিকের কাজ তেমনি শরীরের সবকিছুর হেফাজতকারী হল জীবনীশক্তি
রোগ- ইহা একটি অশুভ অদৃশ্যশক্তি । জীবনীশক্তির যদি কোন রোগের প্রবণতা থাকে তাহলে রোগশক্তি জীবনীশক্তিকে পরাজিত করে দেহে রোগের সৃষ্টি করে ।
অদৃশ্য জীবনীশক্তির সহিত মানবদেহে কি সম্পর্ক?
জীবনীশক্তি জড় মানব দেহের পরিচালক এবং মানবদেহ জীবনীশক্তির অজ্ঞাবহ
সুস্থ অবস্থায় জীবনীশক্তি মানবদেহের প্রতিটি অঙ্গ প্রতঙ্গ যেমন হাত পা, চক্ষু, ফুসফুস, লিভার, হৃৎপিন্ড, কিডনী প্রভৃতি সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ন্ত্রণ করে বলিয়া আমাদের আহার, নিদ্রা, পরিপাক, জৈবিক চাহিদা ইত্যাদি স্বাভাবিক ভাবে থাকে । কোন রোগ জীবাণু দেহে প্রবেশ করিলে জীবনীশক্তি রোগশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে ।
জীবনশক্তি রোগশক্তির দ্বারা পরাজিত হলে জীবনশক্তি তখন কতগুলি শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ প্রকাশ করিয়া বাহিরের সাহায্য কামনা করে । বাহির হতে সদৃশ ঔষধশক্তি প্রয়োগ করিলে রোগশক্তি ধ্বংস হয়ে যায় এবং জীবনীশক্তি রোগমুক্ত হয়ে আবার স্বাভাবিক কাজে ফিরে যায় ।
রোগারোগ্য জীবনীশক্তির সহিত মানবদেহে কি সম্পর্ক/রোগ:
প্রতিরোধে জীবনী শক্তির ভূমিকা কি?
স্বাভাবিক অবস্থায় জীবনীশক্তি মানবদেহের প্রতিটি অঙ্গ প্রতঙ্গকে সুশৃঙ্খল ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। মানব দেহে কোন রোগ জীবাণু প্রবেশ করিলে জীবাণুশক্তি তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে। জীবনীশক্তি পরাজিত হলে রোগশক্তি তার পছন্দের অঙ্গে অবস্থান ও অশুভ ক্রিয়া, শুরু করে । জীবনীশক্তি তখন দৈহিক ও মানুষিক লক্ষণ প্রকাশ করিয়া বাহিরের সাহায্য কামনা কর। বাহির হতে সদৃশ ঔষধশক্তি প্রয়োগ করিলে, রোগশক্তি অপসারিত হয় এবং ঔষধশক্তি তখন আবার জীবনী শক্তিকে আক্রমণ করে । কিন্তু ঔষধশক্তির পরাক্রমশালী হলেও তার স্থায়িত্ব স্বল্প, ফলে জীবনীশক্তি দ্রুত ঔষধশক্তি হতে মুক্ত হয়ে স্বাভাবিক কাজে ফিরে যায় এবং দেহ রোগ মুক্ত হয় ।
উপবিষ (Miasms): উপবিষ বা মায়াজম শব্দের শাব্দিক অর্থ হল যে কোন ক্ষতিকর নিঃসৃত পদার্থ বা একটি দুষিত উৎপাদক । মহাত্মা হ্যানিম্যান মায়াজম সম্পর্কে যে ব্যখ্যা দিয়াছেন সেটা হল মায়াজম একটা সংক্রামক, ব্যাপক, অত্যান্ত সুক্ষ, অদৃশ্য ও গতিশীল জীবন্ত বিষ এবং শেষ পর্যন্ত তিনি এই সিদ্ধান্ত উপনীত হয়েছিলেন যে অধিকাংশ গতিশীল রোগের উৎস এই মায়াজম । হ্যানিম্যানের এই সিদ্ধান্ত ও বর্তমান জীবাণু তত্ত্বের উপর নির্ভর করে আমরা মায়াজমের নিম্নোক্ত সংজ্ঞা প্রদান করতে পারি । মায়াজম জীবনীশক্তির বিশৃঙ্খলা এবং নানারূপ রোগ প্রবণতা সৃষ্টিকারী এক প্রকার সংক্রামক অদৃশ্য গতিশীল জীবন্ত বিষ ।
মায়াজমই সকল প্রকার গতিশীল রোগ ও পাপের আদি কারণ । ইহার প্রভাব বংশানুক্রমিকভাবে চলতে থাকে। মানুষ জন্ম থেকেই মায়জমের প্রভাব নিয়ে পৃথিবীতে আসে এবং সুযোগ ও পারিপাশ্বিকতা এই মায়াজমকে সক্রিয় করিয়া তুলে । এই উপবিষের উৎস তিনটি যথা সোরা, সিফিলিস ও সাইকোসিস ।
সাইকোসিস: ইহা একটি চিররোগ উপবিষ । অবৈধ যৌন সংযোগের ফলশ্রুতি হিসাবে ইহার প্রথম উদ্ভব । ইহা দুই প্রকার যথা- অর্জিত ও অর্পিত । গনোরিয়া রোগ দ্বারা আক্রান্ত হইয়া স্রাব চাপা পড়িলে তাকে অর্জিত সাইকোসিস বলে । পূর্ব পুরুষ হতে প্রাপ্ত সাইকোসিস নামক উপবিষ দেহে উপস্থিত থাকিলে তাকে অর্পিত বলে। সঙ্গম অঙ্গের চারপাশে ডুমুর বা ফুলকপির ন্যায় উপমাংশ বা আচিল ইহার প্রধান লক্ষণ । পুরুষদের ক্ষেত্রে লিঙ্গের মাথায় এবং মহিলাদের যৌনির উপর ও উহার চারপাশে এ সকল উদ্ভেদ দেখা যায় । সাইকোসিসের প্রভাবে দেহকলার পরিবর্তন ঘটে। মনস্তরে সাইকোসিসের পীড়া অত্যন্ত মারাত্মক। ইহার রোগীরা অত্যন্ত হিংসুক, প্রতিহিংসা পরায়ণ, সন্দিগ্ধপরায়ন ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির হয়। বর্ষকালের আর্দ্র আবহাওয়ায় ইহার লক্ষণ বৃদ্ধি পায় ।
সাইকোসিস: একটি যৌন চিররোগ উপবিষ, দূষিত যৌন সংযোগের ফলে সৃষ্টি হয় এবং ইহা মন ও শরীরের প্রত্যেক অবস্থার সমন্বয়ের বিকৃতি ঘটায় । দূষিত যৌন সংযোগের ফলে নাইসেরিয়া গনোরি নামক জীবাণু অসুস্থ্য দেহ হতে সুস্থ্য দেহে সংক্রামিত হয় এবং রোগীর দেহে গনোরিয়ার স্রাব দেখা দেয় । এই পর্যায়ে ইহা একটি স্থানিক রোগ এবং সদৃশ চিকিৎসা দ্বারা নির্দোষ আরোগ্য লাভ করা যায় । কিন্তু যদি অসদৃশ চিকিৎসা দিয়া এই স্রাবকে রুদ্ধ করা হয় তখন রোগের বিষময় ফলটি দেহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এবং সোরা মায়াজমের সহিত মিলিত হয়ে, যে বিষের সৃষ্টি করে তাকে সাইকোসিস’ মায়াজম বা সাইকোসিস দোষ বলে । ইহার ফলে দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলি রোগাক্রান্ত হয়ে নানা লক্ষণের ও নানা নামের রোগের সৃষ্টি হয়ে রোগীর জীবনকে দূর্বিসহ করে তুলে ।
চিররোগের সংজ্ঞা দাও । চিররোগের কারণসমূহ ব্যাখ্যা কর:
চিররোগের সংজ্ঞা— যে সব রোগ চিররোগবীজ তথা সোরা, সিফিলিস ও সাইকোসিস নামক স্থায়ী উপবিষ বা মায়জম দ্বারা সৃষ্ট তাকেই চিররোগ বলে । জীবনীশক্তির রোগ প্রবণতার ফলে ইহা ধীরে ধীরে দৈহিক ও মানসিক বিকৃতি ঘটাতে থাকে, প্রকৃত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত দেহে অবস্থান করে এবং বংশানুক্রমিক ভাবে চলিতে থাকে, তাকে চিররোগ বলে ।
চিররোগের কারণসমূহ হল- সোরা, সিফিলিস ও সাইকোসিস নামক চিররোগ উপবিষ এবং অসদৃশ চিকিৎসার ফলে কৃত্রিম চিররোগ । সোরা- ইহা অযৌন চিররোগ উপবিষ, ইহা মন ও অনুভূতির বিকৃতি ঘটায় ।
সাইকোসিস- ইহা যৌন চিররোগ উপবিষ। ইহা মন ও শরীরের প্রত্যেক অবস্থার সমন্বয়ের বিকৃতি ঘটায়। গনোরিয়া নামক যৌন সংক্রামক ব্যধি যখন অসদৃশ বিধানে চাপা দেওয়া হয় তখন ঐ রোগবিষ সোরা মায়াজমের সঙ্গে মিলিত হয়ে সাইকোসিস, মায়াজমে পরিণত হয় ।
সিফিলিস- ইহাও একটি যৌন চিররোগ উপবিষ, মন ও শরীরের ধ্বংসাত্মক বিকৃতি ঘটায়, সিফিলিস নামক যৌন রোগ অসদৃশ বিধানে চাপা দিলে সিফিলিস রোগ বিষ সোরা মায়াজমের সহিত মিলিত হয়ে সিফিলিস মায়াজমে পরিণত হয় ।
কৃত্রিম চিররোগ- অসদৃশ ঔষধ বার বার প্রয়োগ করিলে ঔষধের দ্বারা সৃষ্ট লক্ষণ, স্থায়ীরূপ ধারণ করে । বার বার ঔষধ প্রয়োগ ইহার মূল কারণ । ঔষধ প্রয়োগ দীর্ঘদিন বন্ধ রাখিলে অনেক. সময় জীবনীশক্তি তার নিজস্ব ক্রিয়া দ্বারা আরোগ্য করে তুলে । রোগীর মৃত্যুর সাথে সাথেই ইহার মৃত্যু হয় । উন্নত জীবনযাত্রা ও পুষ্টিকর খাবার দ্বারা দূর করা সম্ভব-যদি ঔষধ বন্ধ রাখা
হয় ।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunity)
ইমিউনিটি: যে ক্ষমতা বলে দেহ নিজেকে রোগ আক্রমণ থেকে মুক্ত রাখে এবং কোন কোন সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলে তাকে ইমিউনিটি বলে । ইহা জীবনী শক্তির সবল অবস্থা এবং রোগ প্রবণতা সৃষ্টিকারী মায়াজমের প্রভাব নষ্ট করে দেয় ৷
নিম্নোক্ত চার্টের মাধ্যমে ইমিউনিটি শ্রেণী বিভাগ দেখান হল
ইমিউনিটি
অর্পিত (Innate)
অর্জিত (Acquired)
জেনেটিক মেকানিক্যাল
হিউমোরাল
সেলুলার
একটিভ
প্যাসিভ
নেচারাল
আর্টিফিশিয়াল
নেচারাল
আর্টিফিশিয়াল
কোন কোন অবস্থায় ঔষধ পুনঃ প্রয়োগ করা যায় না? নিম্নলিখিত অবস্থায় ঔষধ পুনঃপ্রয়োগ করা যায় না ।:
১। শেষ ঔষধের ক্রিয়া সম্পূর্ণ নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত ঔষধের পুনঃপ্রয়োগ করা যায় না। অর্থ্যাৎ যতক্ষণ পর্যন্ত রোগীর উন্নতি চলতে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত ঔষধের পুনঃপ্রযোগ ও পরিবর্তন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ।
২। ঔষধের ক্রিয়াজনিত বৃদ্ধি যতক্ষণ পর্যন্ত বর্তমান থাকিবে ততক্ষণ পুনপ্রয়োগ নিষিদ্ধ ।
৩। রোগীর ভাল লাগা বোধ যতক্ষণ পর্যন্ত অক্ষুন্ন থাকিবে ততক্ষণ পুনঃপ্রয়োগ চলিবে না ।
৪ । লক্ষণসমূহ আরোগ্যের নির্দিষ্ট ধারা বা ডাঃ হেরিং এর আরোগ্য নীতি অনুসরণ করিয়া চলিলে পুনঃপ্রয়োগের দরকার নাই । আরোগ্যের ধারা হইতেছে ।
ক) ভিতর হইতে বাহিরের দিকে । খ) উপর হইতে নীচের দিকে । গ) মাথা হইতে হাত-পায়ের দিকে ।
ঘ) প্রধান অঙ্গ হতে অপ্রধান অঙ্গে ।
লক্ষণ সমূহ তিরোহিত হবে আর্বিভাবের উল্টোদিকে অর্থ্যাৎ সর্বশেষ লক্ষণ সর্বপ্রথম চলে যাবে এবং সর্বপ্রথম লক্ষণ সর্বশেষ তিরোহিত হবে ।
চ) ঔষধ প্রয়োগের পর লুপ্ত স্রাব দেখা দিলে যেমন মূত্র, ঘর্ম, মল, প্রদরস্রাব, নাসিকাস্রাব ও অন্যান্য চাপাপড়া স্রাব পুনরায় দেখা দিলে ঔষধ পুনঃপ্ৰয়োগ নিষেধ ।
ছ) পুরাতন চর্মরোগ বা উদ্ভেদ, পূরাতন, ক্ষত, ফিসচুলা ইত্যাদি দেখা দিলে ঔষধ পুনঃপ্রয়োগ করা যাবে না ।
দূরারোগ্য রোগে উপশম এর জন্য অল্প ক্রীয়াশীল ঔষধের অতিশীঘ্র পুনঃপ্রয়োগের দরকার হয় এবং তা কখনো ২০০ শক্তির অধিক হবে না ।
ভেষজ, ঔষধ ও রিমেডি:
ঔষধ (Medicine) – হোমিওপ্যাথিক ফার্মাকোপিয়ার নির্দিষ্ট নিয়মে প্রস্তুতকৃত কোন পদার্থ যাহার মানব দেহে রোগ উৎপাদন, রোগ নিরাময় ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে তাকে ঔষধ বলে ৷
ভেষজ (Drug)- ফার্মাকোপিয়ার নির্দিষ্ট নিয়মে প্রস্তুতকৃত কোন পদার্থ যাহার মানব দেহে রোগ উৎপাদন ও রোগ নিরাময় করার ক্ষমতা আছে তাকে ভেষজ বলে। ভেষজ হইতে ঔষধ প্ৰস্তৃত হয় ।
পথ্য (Diet)- রুগ্নদেহের জন্য যে পুষ্টিকর ও সহজ পাচ্য খাবার নির্বাচন করা হয় তাহাই পথ্য ।
কোন কোন খাদ্য ও পানীয়ের নিজস্ব ঔষধিগুণ কোন কোন শক্তিকৃত সূক্ষ্ম মাত্রার ঔষধের ক্রিয়া বিনষ্ট করে বা রোগ লক্ষণ বৃদ্ধি করে । ঐ সব খাদ্যকে বর্জন করাও রোগীর জন্য পথ্য ।
ভেষজ-পরীক্ষা: কোন ঔষধের রোগ উৎপাদন ও রোগ ধ্বংস করার ক্ষমতা নির্ণয় করার যে পদ্ধতি তাকেই ভেষজ পরীক্ষা বলে । এই পরীক্ষায় সুস্থ্য মানবদেহের উপর শক্তিকৃত ঔষধ পরিমতি মাত্রায় প্রয়োগ করা হয় । ঔষধের ক্রিয়া প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ঔষধ প্রয়োগ করা হয় এবং ক্রিয়া প্রকাশ পেলে ঔষধ প্রয়োগ বন্ধ করে তার ফলাফল নির্দিষ্ট নিয়মে মেটেরিয়া মেডিকাতে লিপিবদ্ধ করে রাখা হয় । ঔষধের ক্রিয়ার ফলে যদি কোন অতি অসহ্যকর লক্ষণ বা যন্ত্রগত কোন পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যায় তখনই কেবল কোন ক্রিয়ানাশক পদাৰ্থ বা ক্রিয়ানাশক ঔষধ দ্বারা ঔষধের ক্রিয়া বন্ধ করে দিতে হয়।
ঔষধ পরীক্ষণের শর্তাবলী উল্লেখ কর:
ঔষধ পরীক্ষণের জন্যে প্রভাবের নিম্নলিখিত গুণাবলী- থাকিতে হইবে ।
১। ভেষজ পরীক্ষককে সুস্থ্য, সবল ও স্বাভাবিক হতে হবে ।
২ । পরীক্ষককে বৃদ্ধিমান ও কান্ড জ্ঞান সম্পন্ন হতে হবে ।
৩ । তাঁকে অকপট, সত্যবাদী ও সৎ হতে হবে ।
৪ । দৈহিক ও মানসিক বিকৃতিকারী লক্ষণাবলী চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় ব্যক্ত করার ক্ষমতা সম্পন্ন হতে হবে ।
৫ । পরীক্ষককে শিক্ষিত হতে হবে । তাঁর হোমিওপ্যাথিকের উপর সরল বিশ্বাস ও ভক্তি থাকিতে হইবে ।
৬। সকল দৈহিক ও মানসিক ক্লান্তি, উদ্বেগ, দুর্ভাবনা, দুশ্চিন্তা ইত্যাদি বর্জন করিতে হইবে ।
৭ । কোন জরুরী কাজের জন্য মনযোগ নষ্ট হইতে পারিবে না ।
৮ । ঔষধের ক্রিয়া আরম্ভ হলেই ঔষধ সেবন বন্ধ করিয়া লক্ষণ পর্যবেক্ষণ শুরু করিতে হইবে’।
সুস্থ্য শরীরে ঔষধ পরীক্ষার দর্শন:
১। অসুস্থ্য ব্যক্তি এমনিতেই নানা রকম দুশ্চিন্তা ও অস্বস্থিতে ভোগে । প্রুভিং এর ঔষধ যখন ক্রিয়া করিতে শুরু করে তখন কোনটা ঔষধের লক্ষণ আর কোনটা পীড়ার লক্ষণ তা বুঝা প্রুভারের জন্য কঠিন হইয়া পড়ে ।
২। জীবন ধ্বংসকারী মারাত্মক কোন লক্ষণ দেখা দিলে বা কোন অঙ্গের গঠন বিকৃতি দেখা দিলে তা ঔষধের না পীড়ার লক্ষণ তা বুঝ যাবে না, ফলে প্রতিষেধক ঔষধ নির্বাচন করা কঠিন হবে । ৩। পীড়ার লক্ষণ আর ঔষধের লক্ষণ মিলে জটিল মারাত্মক জীবনীশক্তি ধ্বংকারী লক্ষণ দেখা দিতে পারে ।
ভেষজ: যে পদার্থ সুস্থ্য জীবদেহে রোগ উৎপাদন করিতে পারে এবং অসুস্থ্য দেহের রোগ নির্মূল করিতে পারে তাহাই ভেষজ । কাজেই ভেষজ হল ঔষধিগুণসম্পন্ন বস্তু যাহা হইতে ঔষধ প্রস্তুত হয় ।
ঔষধ পরীক্ষণ: কোন ঔষধের রোগ নাশিনী ক্ষমতা জানতে হলে তার রোগ উৎপাদন শক্তি জানতে হয়। এই উদ্দেশ্য কোন ঔষধের পরিমিত মাত্রা সুস্থ্য ব্যক্তি সেবন করিলে তার দেহে কিছু শারিরীক ও . মানসিক লক্ষণ প্রকাশ পায় । এই লক্ষণ সমষ্টির সদৃশ লক্ষণ প্রাকৃতিক পীড়ায় আক্রান্ত কোন রোগীর দেহে দেখা দিলে এবং ঐ ঔষধের শক্তিকৃত মাত্রা তাকে সেবন করাইলে তাহার রোগ ধ্বংস হয় । সুতরাং নির্দিষ্ট নিয়মে সুস্থ্য ব্যক্তির দেহে কোন ঔষধের রোগ উৎপাদন শক্তি পরীক্ষা করাকে ঔষধ পরীক্ষণ বলে ।
ঔষধের ক্রিয়াকাল: প্রকৃত পক্ষে ঔষধের ক্রিয়াকালের কোন স্থিরতা নাই। রোগীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য, রোগের গভীরতা ও ভোগকালের সময় হিসাবে ঔষদের ক্রিয়াকালও পরিবর্তিত হয়। ঔষধ প্রুভিং এর সময় একটা ঔষধ যতদিন পর্যন্ত সুস্থ্য দেহে ক্রিয়া প্রকাশ করিতেছিল সেই সময় অনুসারে ড্রাগ রিলেশনশিপের তালিকা আছে। উদরাময়ের মত অচির রোগে আর্সিনিক ২০০ শক্তির ঔষধের ক্রিয়া স্বল্পক্ষণের মধ্যে শেষ হয়ে যায় আবার একই ঔষধের একই শক্তি হাঁপানির বেলায় দুইমাস পর্যন্ত ক্রিয়া করিতে পারে ।
আবার শততমিক অপেক্ষা ৫০ সহস্রতমিক পদ্ধতির ঔষধের ক্রিয়ার গতি দ্রুত অথচ ক্ষণস্থায়ী, এজন্য পরিবর্তিত মাত্রায় ঘন ঘন এ পদ্ধতির ঔষধ প্রয়োগে ভাল ফল পাওয়া যায় । ইহাতে পূর্ববর্তী পদ্ধতির চেয়ে অর্ধেক সময় বা চারভাগের এক ভাগের বা আরো কম সময়ে পর্যন্ত ক্রিয়া করেই আরোগ্য করে/ অবদমন হতে পারে। যেমন- হোমিওপ্যাথিক ঔষধের ক্রিয়া চলাকালে অভিনব কোন লক্ষণ প্রকাশিত · হলে আবার অনেক সময় অন্য ঔষধ দ্বারা তাহা অবদমিত করা হয়, ইহার পরিণাম ভাল নয় । ইহা হোমিওপ্যাথিক নীতির পরিপন্থী ।
ঔষধ পরীক্ষণ কী? ঔষধ পরীক্ষণের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা কর:
ভেষজ পরীক্ষা কি?
ভেষজ পরীক্ষা- ঔষধের গুন বা ক্ষমতা নির্ণয় করার জন্য এবং একটি ঔষধের সহিত অন্য একটি ঔষধের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করিয়া মানব জাতির দৈহিক ও মানসিক সুস্থতা সত্বর ও স্থায়ীভাবে পুনরায় ফিরাইয়া আনার জন্য যে পরীক্ষা চালানো হয় তাকে ভেষজ পরীক্ষা বলে । ইহাতে ভেষজকে শক্তিকৃত করিয়া নির্দিষ্ট মাত্রায় সুস্থ মানব দেহে প্রয়োগ করিলে মানব দেহের যে দৈহিক ও মানসিক পরিবর্তন হয় তা বিশুদ্ধ ও বিশ্বস্ততার সহিত লিপিবদ্ধ করিয়া মেটেরিয়া মেডিকার অন্ত র্ভূক্ত করা হয় ।
ঔষধ পরীক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্য কি:
ঔষধ পরীক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্য নিম্নরূপ
১ । ঔষধের রোগ আরোগ্য করার গুন বা ক্ষমতা নির্ণয় । ২। একটি ঔষধ হতে অন্য একটি ঔষধের গুনের পার্থক্য নির্ণয় করা যাতে চিকিৎসাকালে চিকিৎসক অতি সহজেই ঔষধ নির্বাচন করতে পারেন ।
৩। বিশুদ্ধ ও অবিমিশ্র লক্ষণ সংগ্রহ করা ।
হোমিওপ্যাথিতে শক্তিকরণের বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যা দাও:
হোমিওপ্যাথিক শক্তিকরণ- কোন জড় পদার্থকে ক্রমাগত বিভাজিত এবং ঘর্ষণ, মর্দন বা আলোড়িত করিলে জড় পদার্থের অন্ত নিহিত স্থিরশক্তি গতি শক্তিতে পরিণত হইয়া রোগারোগ্যকারী শক্তিতে পরিণত হওয়াকে হোমিওপ্যাথিক শক্তিকরণ বলে ।
শক্তিকরণের বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যা-
১। Dalton’s Atomic Theory অনুসারে কোন জড় বস্তুকে বার বার বিভাজিত করিলে বা ভাঙ্গিলে সূক্ষ্মতম স্তরে নেওয়া যায় । এই বিভাজিত সূক্ষ্মতম স্তরে জড়বস্তু কতগুলি ক্ষুদ্র কণিকায় পরিণত হয় । এই কণিকার নাম পরমাণু । বর্তমানে বৈজ্ঞানিক অভিমত এই যে পরমাণুকে ভাঙ্গিয়া ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন পাওয়া যায় এবং বস্তু অবিনশ্বর ও অন্তহীনভাবে বিভাজ্য পদার্থকে বিভাজনের দ্বারা কত প্রচন্ড শক্তি সৃষ্টি করা যায় বর্তমান যুগের পারমাণবিক বোমা তার জলন্ত প্রমাণ ।
এখানে বৈজ্ঞানিক আইষ্টাইনের সূত্র . প্রণিধান যোগ্য । তার মতে
E = mc2
= M
এখানে =
= ভর
C = আলোর গতি
E = শক্তি
এখান থেকে বুঝা যায় জড় পদার্থ শক্তিতে পরিণত হলে পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয় ।
“শক্তিকৃত মাত্রা রোগকে ধ্বংস করে ।” ব্যখ্যা দাও:
হ্যানিম্যান অর্গানন অব মেডিসিনের ৬ষ্ট সংস্করণ ২৬ নং সূত্র অনুসারে— “জীবদেহের মধ্যে অদৃশ্য কারণে দুইটি পীড়ার মধ্যে-যদি একটি অপরটি অপেক্ষা শক্তিশালী হয় এবং উৎপত্তি হিসাবে বিভিন্ন কিন্তু দৃশ্যতঃ অত্যধিক সদৃশ হয় তা হলে শক্তিশালীটি দুর্বলতরটিকে চিরকালের জন্য ধ্বংস করে দেয়” ।
রোগশক্তির শক্তি নির্দিষ্ট । ইহাকে বাড়ানো বা কমান যায় না ৷ রোগশক্তিকে ধ্বংস করার জন্যে যে সদৃশ শক্তির ঔষধ ব্যবহার করা হয় তা যদি রোগ শক্তির চেয়ে কম হয় তা হলে ঔষধের শক্তির বর্ধিত করিলেই ঔষধ শক্তি দুর্বলতর রোগ শক্তিকে ধ্বংস করে দেয় । সুতরাং শক্তিকৃত মাত্রা রোগকে ধ্বংস করে ।
ক্ষুদ্রতম মাত্রা অথিধকতর কার্যকর কেন :
ক্ষুদ্রতম মাত্রা- হ্যানিম্যানের ৫০ সহস্রতমিক পদ্ধতির অনুসারে ক্ষুদ্রতম মাত্র হল, “একই আকৃতির ১০০টি অনুবটিকার ওজন ১ গ্রেন হয় এমন একটি অনুবটিকা এ ঔষধের দ্বারা ঔষধকৃত বা সিক্ত করলে একে ক্ষুদ্রতম মাত্রা বলে ।
রোগ লক্ষণের সহিত ঔষধের লক্ষণের সদৃশ হওয়ায় ঔষধ রোগের স্থানে অবস্থান গ্রহণ করে রোগকে দেহ হতে অপসারিত করে । রোগশক্তিকে ধ্বংস করিতে রোগশক্তির সমপরিমাণের চেয়ে কিছু বেশী ঔষধ শক্তির প্রয়োজন হয়। ঔষধশক্তির অবশিষ্ট শক্তি তখন জীবনী শক্তিকে আক্রমণ করে, ফলে লক্ষণের বৃদ্ধি পায় যাকে হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি বলে । এই বৃদ্ধি যদিও স্বল্প সময়ের জন্য তথাপি ঔষধের পরিমাণ বা মাত্রা যত ক্ষুদ্র হবে হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি তত সামান্য ও ক্ষণস্থায়ী হবে । মাত্রা বৃহৎ হলে ঔষধজনিত বৃদ্ধি দীর্ঘকাল থাকিয়া রোগীকে দূর্বল করে ফেলে । তাই ক্ষুদ্রতম মাত্রা অধিকতর কার্যকর ।
পরিমিত মাত্রা বলতে কি বুঝ? হোমিওপ্যাথিক শক্তিকরণের বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যা দাও :
পরিমিত মাত্রা (Moderate dose) – পরিমিত মাত্রা বলতে ঔষধের এরূপ পরিমাণকে বুঝায় যা মানবদেহে প্রাথমিক ক্রিয়া প্রকাশ করে, কিন্তু প্রতিক্রিয়া এত ক্ষীন যে প্রায় উপলব্ধি করা যায় না ৷ হোমিওপ্যাথিতে ঔষধ পরীক্ষাকালীন সময়ে পরিমিত মাত্রা এবং রোগী চিকিৎসার সময় সূক্ষ্ম মাত্রা ব্যবহার করা হয় । হ্যানিম্যানের “অর্গনান অব মেডিসিনের” ষষ্ঠ সংস্করণের ১২৮ নম্বর, সূত্র অনুসারে পরিমিত মাত্রার ঔষধের শক্তি ৩০ এবং ১০ নং অনুবটিকার অনুবটির সংখ্যা চার বা ছয়টি ।
শক্তিকরণের বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যা- কোন ভেষজ ভেষজগুনহীন পদার্থের সঙ্গে মিশ্রিত করিয়া ঘর্ষন, মর্দন ও ঝাঁকানি বা আলোড়িত করিলে পদার্থে অন্তনির্হিত স্থিরশক্তি গতিশক্তিতে পরিণত হইয়া পদার্থের অন্তনির্হিত গুণ বর্ধিত, জাগ্রত ও বিকশিত হয় । ফলে উহা রোগ আরোগ্যকারী ক্ষমতায় পরিণত হয় ।
ন্যূনতম মাত্রার ক্ষেত্রে ক্ষুদ্রতম ক্রিয়ার সূত্রটি বর্ণনা:
ন্যূনতম মাত্রা- সদৃশ বিধানে আরোগ্য সাধনে রোগের শক্তির চেয়ে ওষধের শক্তি বেশী হওয়া বিধেয় । ঔষধশক্তি যদি রোগ শক্তির প্রয়োজনের তুলনা অধিক শক্তিশালী হয় তা হলে ঔষধের অতিরিক্ত শক্তি জীবনীশক্তিকে আক্রমণ করে রোগের বৃদ্ধি ঘটায়। এতে জীবনীশক্তি দূর্বল হয়ে পড়ে, এমনকি জীবনীশক্তির ধ্বংস হওয়ারও সম্ভাবনা থাকে । তাই যে পরিমাণ ঔষধে রোগের স্বল্প বৃদ্ধি ঘটে তাহাই ন্যূনতম মাত্রা ।
ন্যূনতম মাত্রার ক্ষুদ্রতম ক্রিয়ার সুত্রটি ফ্রান্সের গণিতবিদ মাউপারটিয়াস কর্তৃক আবিষ্কৃত Law of the least quantity অনুসারে। ঐ সূত্রটি হল, “প্রকৃতির মধ্যে যে কোন পরিবর্তন সাধনের জন্য সামান্যতম ক্রিয়া আবশ্যক” (The quantity of action necessary to effect any change in nature is the least possible)
নিউটনের ৩য় সূত্র অনুসারে “প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে” সুতরাং ঔষধ যখন রোগের উপর ক্রিয়া করে রোগও তখন সমান প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে’। এই ক্রিয়াও প্রতিক্রিয়া সমান হলে রোগের কোন উপশম হয়না অর্থাৎ ফলাফল শূন্য। Law of the least quantity অনুসারে সামন্য ক্রিয়া আবশ্যক” সুতরাং ঔষধের শক্তি যখন রোগশক্তি চেয়ে সামান্য বেশি হবে তখন রোগশক্তি ধ্বংস হয়ে যাবে ।
মাত্ৰাতত্ত্ব (Posology) : বিজ্ঞানের যে শাখায় পরিমাণ বিষয়ক জ্ঞান বা মতবাদ সম্পর্কে আলোচনা, পর্যালোচনা ও গবেষণা করা হয় তাকে মাত্ৰাতত্ত্ব বলে ।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শাস্ত্রের যে অংশে ঔষধ প্রস্তুত, সংরক্ষণ, প্রুভিং রোগীর উপরে ঔষধ প্রয়োগের সময়, ঔষধের মাত্রা, ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা করা হয় তাকে হোমিওপ্যাথিক মাত্ৰাতত্ব বলে ।
লক্ষণ সমষ্টি বলিতে কি বুঝ? লক্ষণ সমষ্টির প্রয়োজনীয়তা লিখ: রোগশক্তি’ যখন জীবনীশক্তিকে পরাজিত করিয়া দেহে প্রভাব বিস্ত ার করে তখন দেহের শারিরীক ও মানসিক অবস্থার বিকৃতি ঘটে । এই বিকৃত অবস্থাসমূহকে একত্রে লক্ষণ সমষ্টি বলে ।
মানুষ যখন পীড়িত হয় তখন সমগ্র মানুষটি পীড়িত হয় । লক্ষণ সমষ্টি হল রোগীর পূর্ণাঙ্গ প্রতিচ্ছবি ৷ তাই লক্ষণ সমষ্টি রোগীর প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করে । লক্ষণ সমষ্টি একাধিক ঔষধের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করিতে সাহায্য করে । লক্ষণ সমষ্টি রোগের মূল কারণ সোরা, সিফিলিস, সাইকোসিস বা অন্য কিছু তা নির্দেশ করে। লক্ষণ সমষ্টি অর্থাৎ দ্বারা রোগটি আরোগ্যযোগ্য কিনা তাও বুঝা যায় ৷ হোমিওপ্যাথিতে লক্ষণ সমষ্টি ছাড়া চিকিৎসা করা সম্ভব নয় ।
গুরুত্ব অনুসারে লক্ষণের স্তরসমূহ:
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা রোগীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও ঔষধের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের উপর প্রতিষ্ঠিত । প্রত্যেকটা ব্যক্তি বা বস্তু কতগুলো বিশেষ বৈশিষ্ট্যের দ্বারা অন্য ব্যক্তি বা বস্তু থেকে স্বাতন্ত্র্য। রোগী চিকিৎসাকালে প্রত্যেকটা রোগীর ক্ষেত্রে আমরা বিভিন্ন শ্রেণীর লক্ষণ দেখতে পাই ।
লক্ষণের গুরুত্ব অনুসারে লক্ষণকে তিনটি স্তর বা গ্রেডে ভাগ করা হয় ।
ক) প্রথম শ্রেণীর লক্ষণ— ঔষধ প্রুভিং এর সময় যে লক্ষণগুলি বারংবার বহু প্রভারের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে । যেমন পালসে টিলার পিপাসাহীনতা ।
(খ) দ্বিতীয় শ্রেণীর লক্ষণ— যে লক্ষণগুলি স্বল্প সংখ্যক প্রুভারের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে ।
(গ) তৃতীয় শ্রেণীর লক্ষণ— যে সকল লক্ষণ কেবল মাত্র খুব অল্প কয়েকজন প্রুভারের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে । আবার লক্ষণের মূল্য হিসাবে-
(ক) মানসিক লক্ষণের মূল্য সর্বাধিক ।
(খ) সর্বদৈহিক লক্ষণের মূল্য দ্বিতীয় ৷
(গ) স্থানীয় লক্ষণের মূল্য তৃতীয় ।
আবার এই তিন শ্রেণীর লক্ষণের মধ্যে ঔষধ নির্বাচন ক্ষেত্রে-
(ক) বিশেষ লক্ষণ
(খ) অসাধারণ লক্ষণ
(গ) বিরল লক্ষণ
(ঘ) অদ্ভূত লক্ষণসমূহের স্থান সর্বাগ্রে ।
কোন প্রকার লক্ষণ ঔষধ প্রয়োগে সহায়ক আলোচনা কর:
চিকিৎসাধীন রোগীর রোগ লক্ষনের মধ্যে যে লক্ষণগুলি অসাধারণ সেই ধরণের লক্ষণসমূহ ঔষধ নির্বাচনে জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যেমন-
(ক) দৃষ্টি আকর্ষণী লক্ষণ (Striking symptom) যেমন পালসেটিলার ক্ষুধা ও তৃষ্ণার অভাব ।
(খ) একক লক্ষণ (singular symptom) যেমন ক্যাকটাসে উচু বালিশে চিৎ হইয়া শয়ন করিলে শ্বাস কষ্টের উপশম ।
(গ) অদ্ভুত লক্ষণ (puculiar symptom) যেমন রাসটক্সে চুপ করিয়া থাকিলে হৃৎকম্পন বা বুকধড়ফরানি বৃদ্ধি এবং হাঁটিলে উপশম ।
(ঘ) বিরল লক্ষণ (Rare symptom) যেমন হিপারে খোলা বাতাসে সব লক্ষণের বৃদ্ধি
অদ্ভুত, বিরল ও অসাধারণ লক্ষণসমূহের ব্যখ্যা কর:
অসাধারণ লক্ষণ— যে লক্ষণগুলি দেহের কোন অংশ বিশেষ বা যন্ত্রের সাথে সম্পর্কযুক্ত । যেমন উদ্ভেদবিহীন চুলকানী ।
বিরল লক্ষণ— যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ খুব কম সংখ্যক পরীক্ষক বা রোগীতে দেখা যায় বা প্রায়ই দেখা যায় না, অথচ রোগীর এ ধরণের লক্ষণ দূরীভূত করার জন্য এমন লক্ষণের ঔষধ বিশেষ ক্ষেত্রে খুবই কাজে লাগে ।
অদ্ভুত লক্ষণ— যে সব লক্ষণ প্রচলিত স্বাভাবিক লক্ষনের বিপরীত ঐ গুলিকে অদ্ভুত লক্ষণ বলে, যেমন- স্বাভাবিক নিয়মে পক্ষাঘাত আক্রান্ত অংশ ঠান্ডা থাকে কিন্ত এলুমিনাতে আক্রান্ত অংশের তাপ বেশী । অন্য অংশের তাপ স্বাভাবিক ।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় ধাতু-প্রকৃতির গুরুত্ব লিখ:
জন্মসূত্রে প্রাপ্ত রোগীর ভিতর যে ধরণের শারীরিক, মানসিক এবং ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায় তাহাই ঐ রোগীর ধাতু- প্রকৃতি (Constitution)। ধাতু প্রকৃতি প্রধানতঃ চার প্রকার যথা-
১ । পিত্ত প্রধান (Bilious) ইহাতে লিভারের ক্রিয়ার বিশৃঙ্খলা থাকে ।
২। শ্লেষ্মা প্রধান (Phlegmatic) ইহাদের কারণে অকারণে ঘন ঘন সর্দি লাগে ।
৩ । রক্ত প্রধান (Sanguineous) ইহাদের শরীরের বিভিন্ন দ্বার হতে রক্তস্রাব হয় ৷
৪ । স্নায়ূ প্রধান (Nervous) উত্তেজনা প্রবণ রোগী ।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় ধাতুপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্য ঔষধ নির্বাচনে গুরুত্ব পূর্ণ ভূমিকা পালন করে । যেমন –
১। রোগী শীতকাতুরে, অত্যন্ত হিংসুক ও বদরাগী, শেষ রাতে ভাল ঘুম হয়, বারে বারে বাহ্যের বেগ হয় কিন্তু বাহ্যে পরিস্কার হয় না; মনে হয় মলভান্ডে মল রহিয়া গেল, আরও একটু হলে ভাল হত ইত্যাদি লক্ষণের সহিত রোগীর মুখ তিতা, টক বা তিতা ঢেকুর লিভারে বিশৃঙ্খলা নির্দেশ করে অর্থাৎ রোগী পিত্ত প্রধান ধাতু প্রকৃতির । সুতরাং তার ঔষধ হবে নাক্স ভমিকা ।
প্রকৃত লক্ষণের বৈশিষ্ট্যগুলি কিকি? প্রকৃত লক্ষণের বৈশিষ্টগুলি নিম্নরূপ:
১ । প্রকৃত রোগ লক্ষণ রোগীর দৈহিক ও মানসিক বিকৃত অবস্থা প্রকাশ করিবে ।
। প্রকৃত রোগ লক্ষণ রোগীর জ্ঞান ইন্দ্রিয় দ্বারা সহজেই বোধগম্য হইবে ।
৩। প্রকৃত লক্ষণের ৬টি পূর্ণাঙ্গ বৈশিষ্ট্য থাকিবে ।
ক) কারণ (Cause)
খ) অবস্থান বিস্তৃরিতসহ (Location with extention)
গ) প্রকৃতি (Nature)
ঘ) অনুভূতি (Sensations)
ঙ) হ্রাস- বৃদ্ধি (Modalities)
চ) সহচর অবস্থা (Concomitants)
চিহ্ন কি? লক্ষণ ও চিহ্নের মধ্যে পার্থক্য কর:
চিহ্ন- চিকিৎসক রোগীকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করিয়া রোগ সম্বন্ধে যে সব তথ্য জানিতে পারেন তাহাই চিহ্ন। যেমন রোগীর গায়ের তাপমাত্রা ১০১°F
চিহ্ন | লক্ষণ |
চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা নিরীক্ষার ফলাফল ৷ | চিকিৎসকের নিকট রোগী নিজের অনুভূতি ও কষ্টের যে বর্ণনা দেন এবং রোগীর আত্মীয়-স্বজন ও সেবাকারী যে সব তথ্য চিকিৎসককে অবগত করেন তাহাই লক্ষণ |
চিহ্নগুলি রোগী চিকিৎসক উভয়ই চিহ্নিত করতে পারেন । যেমন- বমির সঙ্গে রক্ত। | অধিকাংশ লক্ষণ শুধু রোগীই অনুভব করতে পারেন , যেমন মাথাব্যথা ৷ |
কোন রোগে কোন চিহ্ন ছাড়াও চিকিৎসা চলতে পারে । | লক্ষণ ছাড়া ঔষধ নির্বাচন সম্ভব নয় । |
হ্রাস বৃদ্ধি (Modalities): লক্ষণের বৈশিষ্ট্য ছয়টি যেমন, কারণ, অবস্থান, প্রকৃতি, অনুভূতি, সহচর অবস্থা এবং হ্রাস-বৃদ্ধি । সুতরাং হ্রাস-বৃদ্ধি পীড়ার অন্যতম নির্দেশক লক্ষণ । প্রত্যেক রোগী ও ঔষধের কোন লক্ষণ বা লক্ষণ সমষ্টি কখন ও কিসে হ্রাস-বৃদ্ধি হয় তা অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ । হ্রাস-বৃদ্ধি পীড়ার বা রোগীর নির্দিষ্ট চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে । হ্রাস-বৃদ্ধি দুই প্রকার, যথা-
(ক) সর্বাঙ্গীন— যেমন নেট্রাম মিউরে সকাল ১০টায় সকল লক্ষণের বৃদ্ধি হয়
(খ) আঙ্গীক- যেমন নাইট্রিক এসিডে গাড়ীতে চড়িলে মাথা ব্যথার উপশম ।
ব্যাপক লক্ষণ বা সবাঙ্গীন লক্ষণ: যে লক্ষণগুলি দ্বারা ঔষধের ও রোগীর সামগ্রীক বৈশিষ্ট্যকে বুঝায়, রোগীর সম্বন্ধে সর্বতোভাবে প্রযোজ্য এবং যে গুলি বর্ণনাকালে রোগী আমি শব্দটি ব্যবহার করেন সেগুলিকে ব্যাপক লক্ষণ বলে । যেমন রোগী বলে আমি শীতকাতর, আমার রাগ খুব বেশী। রোগীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় তুলিয়া ধরে বলিয়া চিকিৎসা ক্ষেত্রে এই লক্ষণের গুরুত্ব সর্বাধিক । ব্যাপক লক্ষণ দুই প্রকার যথা-
১ । মানসিক ব্যাপক লক্ষণ— যেমন রোগী কৃপন
২। দৈহিক ব্যাপক লক্ষণ— রোগী গরমে এত কাতর যে গায়ে জামা কাপড় সহ্য করিতে পারে না ।
লক্ষণের মূল্য বলিতে কি বুঝ :
লক্ষণের মূল্য বলিতে লক্ষণের গুরুত্ব বুঝায় । হোমিওপ্যাথিক একটি লক্ষণ ভিত্তিক চিকিৎসা। তাই সঠিক চিকিৎসার জন্য নির্ভুল ঔষধ নির্বাচন করা জরুরী। লক্ষণের মূল্য হিসাবে ডাঃ কেন্ট লক্ষণগুলিতে তিন শ্রেণীতে ভাগ করেছেন । যথা-
১। প্রথম শ্রেণীর লক্ষণ- যে সমস্ত লক্ষণ অধিকাংশ প্রভাবের ভিতর প্রকাশিত হইয়াছিল এবং পুনঃপুনঃ প্রুভিং দ্বারা তা সমর্থিত হয়েছে এবং রোগী ক্ষেত্রে ঐ রূপ লক্ষণে ঐ ঔষধ প্রয়োগ করে রোগ উপশম হয়েছে। সেই গুলিকে প্ৰথম শ্রেণীর লক্ষণ বলে । যেমন একোনাইটে ভয়। ডাঃ কেন্টের রেপার্টিরীতে এরূপ লক্ষণের ঔষধ মোটা অক্ষরে লেখা আছে ও এর গাণিতিক মূল্যমান-৩
২। দ্বিতীয় শ্রেণীর লক্ষণ- যে সব লক্ষণ কেবল কয়েকজন প্রুভারের ভিতর প্রকাশিত হয়েছিল এবং পুনঃ পুনঃ প্রুভিং এর সময় তা সমর্থিত হয়েছিল ও মাঝে মাঝে রোগী আরোগ্যের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, এই শ্রেণীর লক্ষণকে দ্বিতীয় শ্রেণীর · লক্ষণ বলে । যেমন-ককুলাস ইন্ডিকাতে সায়েটিকার ব্যথায় সঞ্চালনে বৃদ্ধি । ডাঃ কেন্টের রেপার্টরীতে এ শ্রেণীর লক্ষণের ঔষধ বাঁকানো অক্ষরে লেখা হয়েছে, আর এর গাণিতিক মূল্যমান – ২
৩। তৃতীয় শ্রেণীর লক্ষণ- যে সব লক্ষণ কখন কখন কেবল মাত্র দুই একজন প্রুভারের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছিল কিন্তু পুনঃ প্রুভিং এ কোন সমর্থন পাওয়া যায়নি। কিংবা যে সব লক্ষণ প্রুভিং এর সময় প্রকাশিত হয় নাই কিন্তু ঐ ঔষধটা রোগীর চিকিৎসায় প্রয়োগের পর বার বার ঐ লক্ষণগুলি প্রকাশ পেয়েছে বা আরোগ্য লাভ করে বহু চিকিৎসকের সমর্থন লাভ করেছে ঐ রূপ লক্ষণকে তৃতীয় শ্রেণীর লক্ষণ বলে । যেমন- আর্সেনিকে পৃষ্ঠাদেশে একটা ভারী দন্ড থাকার অনুভূতি । ডাঃ কেন্টের রেপার্টরীতে এ ধরণের লক্ষণের ঔষধ সাধারণ ছাপার অক্ষরে লেখা আছে ও এর গাণিতিক মান – ১ ।
লক্ষণসমষ্টির তাৎপর্য মূল উপাদান সমূহ কি কি: লক্ষণ সমষ্টির তাৎপর্য মূল উপাদান ।
ক) কারণ (Cause)
খ) অবস্থান বিস্তারিতসহ (Location with extention)
গ) প্রকৃতি (Nature)
ঘ) অনুভূতি (Sensations )
ঙ) হ্রাস- বৃদ্ধি (Modalities)
চ) সহচর অবস্থা (Concomitants )
লক্ষণ সংগ্রহের পদ্ধতি বর্ণনা কর:
লক্ষণ সংগ্রহের পদ্ধতি
১। চিকিৎসক প্রথমে রোগীকে তাহার রোগের ইতিবৃত্ত বর্ণনা করিতে বলিবেন । বর্ণনাকালে যেন এমন ধীরে সুস্থ্যে বলেন যাহাতে তাহার বর্ণনা হইতে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় অংশটুকু ধীর, শান্ত ও সঠিকভাবে লিখিয়া নিতে পারেন ।
২। তারপর চিকিৎসক রোগীর আত্মীয় স্বজন ও সেবাকারীদের নিকট হতে প্রয়োজনীয় লক্ষণ সংগ্রহ করিবেন ।
৩। ইহার পর চিকিৎসক নিজে রোগীর B.P, তাপমাত্রা, ল্যাবরেটরীর রিপোর্ট ইত্যাদি দেখিবেন
৪ । রোগীর সঙ্গে এমন ঘনিষ্ট, অন্তরঙ্গ সম্পর্ক স্থাপন করার চেষ্টা করিতে হইবে যাতে রোগী ঙ্কাচ, ভয়; লজ্জার কথা একেবারে ভুলিয়া যায়। নিঃশেষে সব বলিয়া যেন সে তাহার মন হাল্কা করিতে পারে ।
৫। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় অনভ্যস্ত রোগীকে প্রয়োজনে হোমিওপ্যাথিক সম্বন্ধে প্রাথমিক ধারণা দিতে হবে ।
ব্যক্তিনিষ্ঠ লক্ষণ কাহাকে বলে:
ব্যক্তিনিষ্ঠ লক্ষণ— পীড়িত অবস্থায় রোগীকে এবং ঔষধ পরীক্ষণের সময় প্রভার এমন কিছু শারিরীক ও মানসিক লক্ষণ অনুভব করে যে গুলির কোন বাহ্যিক প্রকাশ থাকে না, রোগী না বললে জানা যায় না, ঐ সব লক্ষণকে ব্যক্তিনিষ্ঠ লক্ষণ বলে । যেমন রোগী মাথার বামদিকে ব্যথা অনুভব করে, প্রচন্ড পিপাসা ইত্যাদি ।
নিদানগত লক্ষণের গুরুত্ব বর্ণনা কর:
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা মূলতঃ লক্ষণ ভিত্তিক চিকিৎসা । শারিরীক ও মানসিক লক্ষণই ইহার ভিত্তি। ব্যক্তিনিষ্ঠ ও বস্তুনিষ্ঠ লক্ষণের সাহায্যেই সঠিক ঔষধ নির্বাচিত হয়। এনাটমি, ফিজিওলজি ও প্যাথলজি চিকিৎসা বিজ্ঞানের সহায়ক বিদ্যা। তাই প্যাথলজিক্যাল লক্ষণেরও গুরুত্ব রয়েছে। যেমন রোগী ডান পাশের লিভার প্রদেশের বেদনা নিয়া আসিল, বেদনার ধরণ- হুল ফোটান ব্যথা, সেই সঙ্গে শোথ. পিপাসাহীনতা, ঘর্মহীনতা, প্রস্রাব কম ও স্পর্শসহিষ্ণুতা ইহা এপিস মেলের লক্ষণ । নিদানগত পরীক্ষায় পাওয়া গেল লিভার ছোট হয়ে গিয়েছে। আমরা জানি এপিস মেলের লিভারের উপর ক্রিয়া আছে । সুতরাং রোগের নাম এক প্রকার লিভার সিরোসিস ইহা হোমিওপ্যাথিক ঔষধ নির্বাচনে সহায়ক ।
লক্ষণ রোগের ভাষা-ব্যাখ্যা কর:
লক্ষণ সমষ্টি— ঔষধ প্রুভিং এর সময় প্রুভারের মধ্যে যে দৈহিক ও মানসিক লক্ষণের সৃষ্টি হয় তার সমষ্টি বা প্রাকৃতিক পীড়ায় আক্রান্ত রোগীর মধ্যে যে দৈহিক ও মানসিক লক্ষণের সৃষ্টি হয় তার সমষ্টিই লক্ষণ সমষ্টি । ঔষধ নির্বাচনে লক্ষণ সমষ্টি একমাত্র পথ-প্রদর্শক ।
(ক) ঔষধ, প্রভিং-সুস্থ দেহে শক্তিকৃত ঔষধ স্থূল, মাত্রায় সেবন করলে দৈহিক ও মানসিক লক্ষণের বিকৃতি ঘটে। লক্ষণের এই বিকৃতি বা পরিবর্তনগুলি নির্দিষ্ট নিয়মে মেটেরিয়া মেডিকাতে লিপিবদ্ধ করা হয় ।
(খ) রোগী চিকিৎসা- রোগীর দৈহিক ও মানসিক লক্ষণসমূহের সদৃশ লক্ষণ মেটেরিয়া মেডিকার যে ঔষধের মধ্যে পাওয়া যায় ঐ ঔষধটি প্রয়োগ করিলে রোগী আরোগ্য লাভ করে ।
যেহেতু ঔষধ প্রুভিং বা রোগের চিকিৎসা করতে গেলে লক্ষণের উপরই নির্ভর করিতে হয় । তাই লক্ষণকেই রোগের ভাষা বলা হয় ।
স্থানিক লক্ষণ (Local symtoms ): যে সব লক্ষণ দ্বারা ঔষধের বা রোগীর কোন অঙ্গের সংশ্লিষ্ট লক্ষণের বুঝায় ঔষধ বা রোগীর সামগ্রিক ব্যক্তিসত্ত্বাকে বুঝায় না, তাকে স্থানিক লক্ষণ বলে ।
যেমন আর্সেনিকের রোগী শীতকাতর, কিন্তু মাথায় ঠাণ্ডা চায় । এখানে ঠাণ্ডায় মাথার উপসর্গের উপশম স্থানিক লক্ষণ ।
লক্ষণ সমষ্টির গুরুত্ব লিখ:
জীবনীশক্তির অস্বাভাবিক কার্যক্রমকে লক্ষণ বলে। আর লক্ষণ সমষ্টি বলতে বুঝায় রোগীকে দৈহিক ও মানসিক বিকৃতি, রোগীর অনুভূতি, মেজাজ, স্বভাব-চরিত্র, ‘ বংশগত ইতিহাস, পারিবারিক/ সামাজিক/ অর্থনৈতিক অবস্থান রোগের হ্রাস-বৃদ্ধি ইত্যাদির সমষ্টির । হোমিওপ্যাথিক ঔষধ নির্বাচন করা হয় লক্ষণ সমষ্টির উপর ভিত্তি করিয়া। রোগীর রোগ লক্ষণের সমষ্টির সদৃশ লক্ষণযুক্ত যে ঔষধ পাওয়া যায় সেটাই হল রোগীর জন্য আরোগ্যকারী ঔষধ । তাই লক্ষণ সমষ্টি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মধ্যে নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো বিদ্যমান ।
১ । লক্ষণসমষ্টি রোগীর পূর্ণাঙ্গ প্রতিচ্ছবি
২ । লক্ষণ সমষ্টি রোগ নির্ণয় ও ঔষধ নির্ণয় উভয় ক্ষেত্রে সাহায্য করে
৩ । লক্ষণ সমষ্টি একাধিক ঔষধের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে ।
৪ । লক্ষণ সমষ্টি রোগের মূল কারণ অনুমান করতে সাহায্য করে রোগের মূল কারণ সোরা, সিফিলিস ও সাইকোসিস ।
৫। লক্ষণ সমষ্টি রোগের প্রকৃতি নির্ণয়ে সাহায্য করে, রোগটি চিকিৎসার আওতাধীন কিনা তা বুঝতে সাহায্য করে ।
৬ । লক্ষণ সমষ্টি হতে কোন রোগ বা লক্ষণ চাপা পড়েছে কিনা তা বুঝা যায় ৷
ডায়াগনসিস ও এনামনোসিস সম্বন্ধে যা জান লিখ:
ডায়াগনসিস- ইহা এলোপ্যাথিক চিকিৎসার একটি অপরিহার্য অঙ্গ । Clinical diagnosis, Labortary diagnosis এবং Pathological diagnosis এই তিনটি হল এর ভিত্তি । এই তিনটি পদ্ধতির সাহায্যে রোগীর রোগের প্রকৃতি নির্ণয় করিয়া পরিচিত নামের একটি রোগে ইহাকে অন্তর্ভূক্ত করা অথবা কোন নামের লক্ষণের সঙ্গে না মিলিলে একটি নুতন নামে অভিহিত করা ।
কিন্তু হোমিওপ্যাথিতে রোগের নামে চিকিৎসা করা হয় না চিকিৎসা করা হয় রোগী ব্যক্তিনিষ্ট ও বস্তুনিষ্ট লক্ষণের উপর ভিত্তি করিয়া। তবে সহায়ক চিকিৎসা বিজ্ঞান হিসাবে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাতে ডায়াগোনসিসের বিশেষ ভূমিকা আছে ।
এনামনেসিস- হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় চিররোগের, ক্ষেত্রে সঠিক ঔষুধ নির্বাচনের জন্য লক্ষণসমূহের যে বিশ্লেষণ করা হয় তাকেই এনামনেসিস বলে । এক কথায় রোগীর শারিরীক ও মানসিক বিকৃতির বিশ্লেষণ। যেমন রোগীর ধাতুগত লক্ষণ, রোগীর অতীত ও বর্তমান লক্ষণের ইতিহাস, পারিবারিক ইতিহাস, রোগের হ্রাস-বৃদ্ধি, দৈহিক গঠন, সর্বাঙ্গীন লক্ষণ, একক লক্ষণ/বিশেষ লক্ষণ/ অদ্ভুত লক্ষণ, পীড়ার উৎপত্তির কারণ পরিপোষক কারণ, উত্তেজক কারণ, রোগ আরোগ্য বাধা ইত্যাদি ।
হোমিওপ্যাথিক রোগ নিণয়: রোগ নির্ণয় বা Diagnosis এলোপ্যাথিক চিকিৎসার একটি অপরিহার্য অঙ্গ । Chemical diagnosis, Laboratory diagnosis এবং Pathological diagnosis এই তিনটি হল এর ভিত্তি । এই তিনটি পদ্ধতির সাহায্য রোগীর রোগের প্রকৃতি নির্ণয় করিয়া পরিচিত নামের একটি রোগে ইহাকে অন্তর্ভূক্ত করা অথবা কোন নামের লক্ষণের সঙ্গে না মিলিলে একটি নূতন নামে অভিহিত করা ।
চিকিৎসা কিন্তু হোমিওপ্যাথিতে রোগের নামে চিকিৎসা করা হয় না, করা হয় রোগীর ব্যক্তিনিষ্ট ও বস্তুনিষ্ট লক্ষণের উপর ভিত্তি করিয়া । তবে সহায়ক চিকিৎসা বিজ্ঞান হিসাবে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাতে রোগ নির্ণয়ের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে যেমন—
১। রোগ নির্ণয় দ্বারা রোগের ভোগকাল ও ক্রমোন্নতি সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করা যায় ৷
২। রোগ নির্ণয় দ্বারা ঔষধ নির্বাচন সহজ হয় ।
৩। রোগ নির্ণয় দ্বারা বুঝা যায় রোগটি স্বাস্থ্য বিধি চিকিৎসা, অস্ত্র চিকিৎসা অথবা ঔষধজ চিকিৎসার অন্তর্ভূক্ত ।
৪ । রোগ নির্ণয় দ্বারা রোগের সাংঘাতিকতা সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যায় । ৫ । রোগ নির্ণয় দ্বারা পথ্যাপথ্য নির্বাচনের সহায়তা হয় ।
রোগ লিপি বলিতে কি বুঝ?:
রোগ লিপি- রোগীর নিকট হতে, তার আত্মীয় স্বজন বা সেবাকারীর নিকট হতে রোগ এবং রোগীর যে সকল লক্ষণ পাওয়া যায় এবং চিকিৎস জিজ্ঞাসা করিয়া ও ব্যক্তিগতভাবে পরীক্ষা করিয়া সে সব লক্ষণ সমষ্টি অবগত হন তা নির্দিষ্ট নিয়মে লিপিবদ্ধ করে রাখাকে রোগলিপি বলে ।
একটি আদর্শ রোগ লিপি প্রস্থতে চিকিৎসকের নিম্নলিখিত গুনাবলী- থাকিতে হইবে ।
১। পূর্ব সংস্কার হতে মুক্তি
২ । ইন্দ্রিয় শক্তির অটুট ক্ষমতা
৩ । মনযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ
একটি আদর্শ রোগলিপি তৈরি করা শেষ হলে চিকিৎসা কার্যের প্রধান অংশ শেষ হইয়াছে বলিয়া ধরিয়া নেওয়া হয় ।
রোগীলিপি:
রোগ লিপি বলিতে কি বুঝ? একটি আদর্শ রোগলিপি প্রস্তুতে চিকিৎসকের গুনাবলী আলোচনা কর :
রোগ লিপি- রোগীর নিকট হতে, তার আত্মীয় স্বজন বা সেবাকারীর নিকট হতে যে সকল রোগ লক্ষণ পাওয়া যায় এবং চিকিৎসক ব্যক্তিগত ভাবে পরীক্ষা ও জিজ্ঞাসা করিয়া যে সব রোগ লক্ষণ সমষ্টি অবগত হন তা নির্দিষ্ট নিয়মে লিপিবদ্ধ করিয়া রাখাকে রোগ লিপি বলে ।
একটি আদর্শ রোগলিপি প্রস্তুতে চিকিৎসকের নিম্নলিখিত গুনাবলী থাকিতে হইবে ।
১। পূর্ব সংস্কার হইতে মুক্তি— মনে করি পূর্বের কোন রোগীর ব্যথার ধরণ ছিল “হঠাৎ আসে হঠাৎ যায়” এবং বেলেডোনায় উপশম হয়েছিল । অনুরূপ দ্বিতীয় রোগীর বেলায়ও যদি হঠাৎ আসে হঠাৎ যায়” লক্ষণটি অন্যান্য ঔষধের মধ্যে খোঁজা হয় যথা পালসেটিলা, ম্যাগ-ফস ইত্যাদি. তাহলে ইহা হইবে সংস্কার মুক্তি ।
২। ইন্দ্রিয় শক্তির অটুট ক্ষমতা- চিকিৎসকের পঞ্চম ইন্দ্রিয় যথা নাক, কান, চোখ, জিহবা, চর্ম কার্যক্ষম থাকিতে হইবে ।
৩ । মনযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ- মনযোগ সহকারে পরীক্ষা ও লক্ষণ সমূহ সংগ্রহ করিতে হইবে । রোগীর কথা মনযোগ দিয়া না শুনিলে হয়ত গুরুত্ব পূর্ণ লক্ষণ লিপিবদ্ধ হবে না, ফলে সঠিক রোগ লিপিও তৈরী হবে না ।
৪। রোগলিপি অংকনে বিশুদ্ধতা— রোগীর রোগ লক্ষণের বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করা হলে চিকিৎসা কার্যের একটি প্রধান অংশ শেষ হইয়াছে বলিয়া ধরিয়া নেওয়া হয় । কাজেই রোগ লিপির বিশুদ্ধতা রক্ষা করতে হবে ।
প্রকৃত আরোগ্যে চিকিৎসকের কোন তিনটি বিষয়ে জ্ঞান থাকা আবশ্যক?:
মানব স্বাস্থ্যের বিকৃতি আর রোগ উৎপাদনকারী অবস্থা সমুদয়কে অপসারিত করে মানুষকে সুস্থ রাখার উপায় যিনি জানেন তাকেই বলে স্বাস্থ্য সংরক্ষক । একজন চিকিৎসকের নিম্নোক্ত বিষয়ে জ্ঞান থাকা আবশ্যক ।
১. রোগ সম্বন্ধে জ্ঞান – কি ধরনের রোগ, রোগে কি আরোগ্য করিতে হইবে, রোগ যে সকল লক্ষণ দ্বারা সূচিত হয়, সে সকল লক্ষণ সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে ।
২. ঔষধ সম্বন্ধে জ্ঞান প্রতিটি ঔষধ ভিন্ন ভিন্ন লক্ষণ দ্বারা তার আরোগ্যশক্তি প্রকাশ করে, ঔষধগুলির ক্রিয়ার পার্থক্য সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে ।
৩. রোগের কারণ ও আরোগ্যের পথে বাঁধা সমূহ – রোগের প্রকৃত কারণ নির্ণয় করিতে হইবে । কারণ জানা থাকিলে, আরোগ্য সহজ হয় । আরোগ্যের পথে কোন বাধা আছে কিনা— যেমন উত্তেজক কারণ, পরিপোষক কারণ থাকলে তা দূর করার ব্যবস্থা, করতে হবে।
রোগারোগ্যের প্রাকৃতিক নিয়ম ব্যখ্যা কর :
রোগারোগ্যের প্রাকৃতিক নিয়মটি হল- জীব দেহের মধ্যে অবস্থানরত দুটি পীড়া যাহাদের উৎস ভিন্ন কিন্তু দৃশ্যতঃ অত্যাধিক সদৃশ উহাদের মধ্যে শক্তিশালীটি দুর্বলটিকে ধ্বংস করে দেয় ।
উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় রাত্রির উজ্জ্বল তারকার আলো দিনের বেলার সূর্যের আলো দ্বারা বিলীন হয়ে যায় ।
রোগ এবং ঔষধ দুটিই অদৃশ শক্তি কিন্তু তাদের উৎস ভিন্ন । রোগশক্তি স্থির, তাকে বাড়ান যায় না । কিন্তু ঔষধের শক্তি বাড়ান যায় । ঔষধের শক্তি রোগশক্তি থেকে বেশী হলেই তা রোগশক্তিকে ধ্বংস করে এবং রোগ আরোগ্য হয় ।
আরোগ্যের ধারা আলোচনা কর:
যদি রোগীর যাবতীয় লক্ষণ সমষ্টি বিনা কষ্টে, তাড়াতাড়ি, শান্ত ভাবে, সহজবোধ্য নীতিতে ও নির্দোষ প্রথায় ভেতর থেকে বাহিরে, উর্ধাঙ্গ হতে নিম্নাঙ্গের দিকে, মাথা হতে হাত ও পায়ের দিকে, অধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হতে কম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে এবং সবশেষ কষ্টকর অবস্থা । থেকে সবচেয়ে প্রথমের কষ্টকর অবস্থা দিকে পরিচালিত হলে তবে তাকেই আদর্শ আরোগ্য বলে । সেই সঙ্গে রোগী মানসিক স্বস্তিবোধ ও স্ফুর্তিবোধ করিবে ।
আরোগ্যের বিকৃতগতিপথ বলিতে কি বুঝ:
চিররোগে যদি অসদৃশ ঔষধ বার বার প্রয়োগ করা হয় তাহলে ঔষধজ লক্ষণ দেখা দেয়। ঔষধজ লক্ষণগুলি চিররোগের লক্ষণের সহিত মিলিত হইয়া একটি মিশ্র ও জটিল রোগের লক্ষণ সমষ্টি সৃষ্টি করে । যার সদৃশ ঔষধ খুঁজে পাওয়া যায় না । ইহাই আরোগ্যের বিকৃত গতিপথ ৷
আরোগ্যের জটিলতাগুলি কিকি?:
আরোগ্যের জটিলতা বা প্রতিবন্ধকতাসমূহ নিম্নরূপ
১। পীড়ার মুল কারণ, যথা- সোরা, সিফিলিস ও সাইকোসিস নামক চিররোগ উপবিষ ।
২ । চাপা পড়া কোন রোগের ইতিহাস যা রোগী ভুলে যায় ।
৩ । ধাতুগত বা জন্মগত কোন কারণ, যেমন সর্দির প্রবণতা । ৪ । কোন গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ যা রোগীর কাছে গুরুত্বহীন মনে হয় বলে চিকিৎসকের কাছে প্রকাশ করেনা ।
৫ । পীড়ার উদ্দীপক কারণ ।
৬। পীড়ার পরিপোষক কারণ ।
৭ । ঔষধজনিত কোন চিররোগ ।
আরোগ্য ও উপশমের মধ্যে পার্থক্য কি? আরোগ্য ও উপশমের পার্থক্য:
আরোগ্য | উপশম |
আরোগ্যের অর্থ দৈহিক ও মানসিক সকল প্রকার লক্ষণগুলি স্থায়ীভাবে দেহ থেকে দূরীভূত করা। এমন কি রোগীর স্বভাব চরিত্র ও অনুভূতি সমস্তই স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসতে হবে । | রোগীর কষ্টকর উপসর্গ সমূহ সাময়িকভাবে দূরীভূত করিয়া রোগীকে আরাম দান করাকে উপশম বলে । |
ইহাতে রোগী অসুখ পূর্ব স্বাস্থ্য ফিরে স্বাস্থ্য ফিরে পায় । | ইহাতে রোগী অসুখ পূর্ব স্বাস্থ্য ফিরে স্বাস্থ্য ফিরে পায় না। |
আরোগ্য রোগ লক্ষণ ফিরে আসে না । | উপশমের রোগ লক্ষণ চাপা পড়ে বা বার বার ফিরে আসে । |
স্থায়ী ভাবে আরামরোধ করে । | অস্থায়ীভাবে- কোন কোন সময় মাত্র কয়েক ঘণ্টা বা দিন আরাম রোধ করে । |
|
|
আরোগ্যর ধারা বর্ণনা কর:
লক্ষণই রোগের পরিচয় । লক্ষণ চলিয়া গেলে রোগী আরোগ্য লাভ করে বা সুস্থ্য হয় । একে একে রোগের প্রকাশিত লক্ষণগুলি চলিয়া যাওয়ার পর রোগী যদি স্বস্তিবোধ করে, কাজ-কর্মে স্ফুর্তি পায় এবং কোন লক্ষণ ফিরিয়া না আসে তবেই প্রকৃত আরোগ্য লাভ হয় । প্রকৃত আরোগ্যের ধারাগুলি নিম্নরূপ-
১। কেন্দ্র হতে পরিধির দিকে বা ভিতর হতে বাহিরের দিকে
২। উপরের দিক হতে নীচের দিকে বা মাথা হতে হাত ও পায়ের দিকে ।
৩’। অধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হতে অপেক্ষকৃত কম গুরুত্বপুর্ণ অঙ্গের দিকে ।
৪ । অবির্ভাবের বিপরীত বা উল্টা দিকে অর্থ্যাৎ সর্বশেষ আক্রান্ত অঙ্গ সর্বপ্রথম রোগ মুক্ত হবে এবং সর্বপ্রথম আক্রান্ত অঙ্গ সর্বশেষে রোগমুক্ত হবে ।
ভাবীফল বলতে কি বুঝ? ঔষধের রোগারোগ্য ক্ষমতা কিসের উপর নির্ভর করে?:
ভাবীফল- সাধারণভাবে বিশেষ বিশেষ রোগের ভবিষ্যৎ পরিণতি কিরূপ হবার সম্ভাবনা থাকে এবং রোগীর বয়স, দৈহিক অবস্থা প্রভৃতি বিশেষ ভাবে বিচার করে রোগীর ভবিষ্যৎ অবস্থার পরিণতি কি হতে পারে সে বিষয় জানা বা বোঝাকে প্রোগনোসিস বলে ।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসারে ডায়াগনোসিস ও প্রেসক্রিপশনের মাধ্যমে নির্বাচিত রিমেডি রোগীর দেহে প্রয়োগের পর চিকিৎসক যে ফলাফল পর্যবেক্ষণ করেন তাহাই ভাবীফল । যেমন – ১। ঔষধ প্রয়োগের পর যদি দেখা যায় রোগ লক্ষণের বৃদ্ধি দীর্ঘ স্থায়ী, তাহলে ভাবীফল হবে রোগীর অবস্থার চরম অবনতি ।
২। ঔষধ সেবনের পর রোগ লক্ষণের বৃদ্ধি দ্রুত হলেও তা স্বল্পকাল স্থায়ী হলে বুঝতে হবে ভাবীফল শুভ ।
৩। ঔষধ সেবনের পর যদি দেখা যায় নুতন লক্ষণের আবির্ভাব ঘটেছে যা রোগীর মধ্যে ছিল না তাহলে ভাবীফল অনুকুল নয়, ঔষধ নির্বাচনে ভুল হয়েছে
৪ । যদি চাপাপড়া পূরাতন লক্ষণের আবির্ভাব হয় তাহলে ভাবীফল অনুকুল ।
ঔষধের রোগারোগ্য ক্ষমতা— ঔষধের আরোগ্য ক্ষমতা নিম্নলিখিত শর্তের নির্ভরশীল
১। রোগীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও ঔষধের সত্ত্বার স্বাতন্ত্র্য সদৃশ
হতে হবে ।
২ । ঔষধের শক্তি রোগশক্তির চেয়ে বলবান হতে হবে ।
৩ । ঔষধটির সুস্থ্য দেহে সদৃশ লক্ষণ সৃষ্টির ক্ষমতা থাকতে হবে ।
আরোগ্যের সর্বোচ্চ আদর্শ কি:
আরোগ্যের সর্বোচ্চ আদর্শ হল রোগীকে আংশিক বা আঙ্গিকভাবে নয়, সামগ্রীকভাবে আরোগ্য করা। রোগীর সমস্ত দৈহিক ও মানসিক লক্ষণ সম্পূর্ণরূপে দূর করাই আরোগ্য । আর সর্বোচ্চ আরোগ্য বিধানটি হতে হবে ।
১ । অচিরে
২ । নিরূপদ্রবে
৩ । স্থায়ীভাবে
৪। স্বাস্থ্যের পুনঃপ্রবর্তন বা সর্বপেক্ষা সরল, বিশ্বাসযোগ্য ও অনিষ্টহীন প্রথায়
৫। সম্পূর্ণভাবে এবং সহজবোধ্য বিধানমতে রোগের দূরীকরণ বা ধ্বংস সাধন, ইহাই আরোগ্যের সর্বোচ্চ আদর্শ ।
৮৭ । স্বাস্থ্য রক্ষায় জীবনীশক্তি কি ভূমিকা পালন করে ।
সুস্থ্য অবস্থায় জীবনীশক্তি আমাদের দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রতঙ্গ এমন নিখুঁত সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যে আমরা কোন অঙ্গ-প্রতঙ্গের কার্যক্রম টেরই পাই না । ফলে নীরবে আমাদের দেহের বৃদ্ধি, পুষ্টি ও ক্ষয়পূরণ হইতেছে, আমরা কথা বলি, সাড়া দেই, জাগতিক সব কাজ কর্ম করিয়া চলি ।
দেহে কোন রোগ জীবাণু প্রবেশ করিলে জীবনীশক্তি তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে । জীবনী শক্তিকে পরাজিত করিয়া রোগশক্তি দেহে রোগ উৎপাদন করিলে জীবনীশক্তি আমাদের বিকৃত শারিরীক ও মানসিক লক্ষণগুলি বাহিরে প্রকাশ করিয়া সাহায্য কামনা করে ! আমরা ঔষধ সেবন করি, রোগ ধ্বংস হয়, জীবনীশক্তি ভারমুক্ত হয়ে আবার স্বাভাবিক কাজে ফিরে যায় ।
হোমিওপ্যাথিতে ঔষধ শক্তিকরণের তাৎপর্য/ক্ষুদ্রতম ক্রিয়ানীতি ব্যখ্যা কর ।
হোমিওপ্যাথিতে ঔষধ শক্তিকরণের তাৎপর্য –
ঔষধের মূল আরক বা নিম্নশক্তির ঔষধ অল্প সংখ্যক ও সাধারণ লক্ষণ প্রকাশ করে । ফলে একটি ঔষধের লক্ষণের সাথে অন্য একটি ঔষধের লক্ষণের পার্থক্য করা কঠিন হইয়া পড়ে। অন্যদিকে ঘর্ষণ, মর্দন বা আলোড়নের ফলে ঔষধের অন্তনির্হিত শক্তি বিকশিত হয় ফলে ঔষধের নিজস্ব একক, বিরল, অদ্ভুত ইত্যাদি লক্ষণগুলি প্রকাশিত হয়ে একটি ঔষধ হতে অন্য ঔষধটির পার্থক্য নির্দেশিত হয় ।
প্রতিকারক ঔষধ (Remedy) বা রোগনাশক ঔষধ: রোগীর শারিরীক ও মানসিক লক্ষণ সদৃশ ঔষধ প্রয়োগ করার পর যদি সমস্ত লক্ষণের উপশম হইয়া পুর্বের স্বাস্থ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয় তবে ঐ ঔষধকে প্রতিকারক ঔষধ বলে ।
উপশম: ইহা পীড়ার একটি নির্দেশক লক্ষণ । লক্ষণের ৬টি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে উপশম অন্যতম । প্রত্যেক পীড়ায় রোগী ও ঔষধের কখন, কিসে উপশম হয় তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোন কোন সময় শুধুমাত্র উপশমের লক্ষণ দ্বারা ঔষধ নির্দেশিত হয়। যেমন— জেলেসিমিয়ামের রুক ধড়ফড়ানির সময় নড়াচড়া করিলে উপশম ।
প্রতিষেধক ঔষধ (Prophylatic): রোগ প্রতিষেধক ঔষধ প্রয়োগের অর্থ রোগাক্রান্ত হবার প্রবণতা দূর করা। ধাতুগত দোষের চিকিৎসাই রোগীর কোন রোগ প্রতিষেধকের প্রকৃত পথ। তবে কোন সংক্রামক রোগীর প্রতিষেধক ঔষধ নিধারণ করার জন্যে ঐ বছরের ঐ সংক্রামক রোগের রোগচিত্রটা যে ঔষধের মত তা ব্যবহার করা উচিত। যেহেতু ঔষধের ক্রিয়া অস্থায়ী সুতরাং আক্রান্ত এলাকায় ব্যবহারিত ঔষধে ক্রিয়াকাল শেষ হলে বার বার ব্যবহার করা উচিত যে পর্যন্ত সংক্রামন বজায় থাকে ।
আরোগ্য ও উপশমের পার্থক্য:
উপশম
–
ঔষধ প্রয়োগ করার পর যদি রোগীর বর্তমান উপসর্গসমূহের মধ্য হতে আংশিক লক্ষণ চলে যায় অথবা রোগীর কোন কষ্ট সাময়িকভাবে চলে গিয়ে। আবার ফিরে আসে তাকে উপশম বলে । যেমন চর্ম রোগে বাহ্যিক মলম প্রয়োগ করিলে ঘা শুকিয়ে চুলকানি কমে যায়। কিন্তু তারপরও অস্থিরতা ও অন্যান্য লক্ষণ থেকেই যায় ।
–
আরোগ্য – ঔষধ প্রয়োগ করার পর যদি রোগীর বর্তমান দৈহিক ও মানসিক সব লক্ষণ নির্মল / নির্দোষ / পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়া চলে যায় তাকে আরোগ্য বলে ।
আরোগ্যের ক্ষেত্রে ডাঃ কেন্টের পর্যবেক্ষণসমূহ সংক্ষেপে আলোচনা কর:
ক) উপর হইতে নীচ দিকে
খ) ভিতর হইতে বাহিরের দিকে
গ) গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হতে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে পীড়ার গতি হলে ।
ঘ) আরোগ্যের গতি আবির্ভাবের বিপরীত দিকে হলে অর্থাৎ সর্বশেষ আক্রান্ত অঙ্গ প্রথম এবং সর্বপ্রথম আক্রান্ত অঙ্গ সর্বশেষে রোগমুক্ত হলে ।
চিররোগের ক্ষেত্রে কিভাবে দ্বিতীয় ব্যবস্থাপত্র দেওয়া হয়:
দ্বিতীয় ব্যবস্থাপত্র- পূর্বের যে কোন সংখ্যক ব্যবস্থাপত্রের পর নুতনভাবে ব্যবস্থাপত্র প্রদানই হল দ্বিতীয় ব্যবস্থাপত্র। অর্থ্যাৎ একের পর এক পূর্ববর্তী ঔষধের পর পরবর্তী ঔষধ নির্বাচন বা প্রথম ব্যবস্থাপত্রের ঔষধের ক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করিয়া রোগীর পরিবর্তিত অবস্থাকে অনুসরণ করিয়া যে ব্যবস্থাপত্র প্রদান করা হয় তাহাই দ্বিতীয় ব্যবস্থাপত্র। দ্বিতীয় ব্যবস্থাপত্র প্রথম ব্যবস্থাপত্রের পুনঃপ্রয়োগ বা প্রতিষেধক বা পরিপুরকও হতে পারে ।
চিররোগের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ব্যবস্থাপত্র তৈরির দিক নির্দেশনা
১। রোগীকে পুনরায় পরীক্ষা করে পূর্বের রেকর্ড পত্রের সঙ্গে বর্তমান লক্ষণ তুলনা করিতে হইবে ।
২। যে ঔষধ অংশিকভাবে আরোগ্য ঘটায় সেই ঔষধই প্রায়শঃ আরোগ্যের সমাপ্তি ঘটায়। কাজেই সঙ্গত কারণ না থাকিলে ঔষধ পরিবর্তন করিতে নাই ।
৩ । নূতন কোন লক্ষণ দেখা দিলে অবশিষ্ট লক্ষণ ও নূতন লক্ষণের সমষ্টির সদৃশ ঔষধ নির্বাচন করতে হবে। এইরূপে তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ সকল বারেই পূর্ববর্তী লক্ষণ অবশ্যই বিবেচনায় আনতে হবে ।
৪। প্রথম ব্যবস্থাপত্রের সময় হয়তো রোগীর মধ্যে সোরিক মায়াজমের প্রভাব প্রকাশ্যে ছিল, এন্টিসোরিক ঔষধ প্রয়োগ করার পর দেখা গেল রোগীর মধ্যে এন্টিসোরিক প্রভাব চলে গিয়ে সিফিলিটিক লক্ষণ প্রকাশ্যে চলে এসেছে, তখন ২য় ব্যবস্থাপত্রে এন্টিসিফিলিটিক ঔষধ ব্যবস্থা করতে হবে ।
কখন এবং কেন দ্বিতীয় ব্যবস্থাপত্র প্রদান করিতে হয় :
দ্বিতীয় ব্যবস্থাপত্র— প্রথম ব্যবস্থাপত্রের ঔষধের ক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করিয়া রোগীর পরিবর্তিত অবস্থাকে অনুসরণ করিয়া যে ব্যবস্থাপত্র প্রদান করা হয় তাহাই দ্বিতীয় ব্যবস্থাপত্র । পূর্বের যে কোন সংখ্যক ব্যবস্থাপত্রের পর নুতনভাবে ব্যবস্থাপত্র প্রদান বা একের পর এক পূর্ববর্তী ঔষধের পর পরবর্তী ঔষধ নির্বাচনই দ্বিতীয় ব্যবস্থাপত্র । প্রথম ব্যবস্থাপত্রের পনুঃপ্রয়োগ বা প্রতিষেধক বা পরিপূরকও হতে পারে । দ্বিতীয় ব্যবস্থাপত্র চারটি সংকেতের উপর নির্ভরশীল ।
পূর্ব ঔষধের পুনঃপ্রয়োগ
(ক) রোগীর প্রাথমিক লক্ষণগুলি ফিরে আসলে ।
(খ) যখন রোগের কিছুটা উন্নতি হয়ে এক স্থানে দাঁড়িয়ে যায় ।
ক্রিয়ানাশক ঔষধের সংকেত ।
(ক) নূতন লক্ষণের আর্বিভাব হয় এবং রোগীর কোন রূপ উন্নতির
লক্ষণ দেখা যায় না।
(খ) রোগ অত্যন্ত বৃদ্ধি পেলে এবং কমার লক্ষণ না থাকলে (গ) চিররোগের ক্ষেত্রে নির্বাচিত ঔষধটি ক্রিয়ারত মায়াজমের সদৃশ
না হয়ে সুপ্ত মায়াজম সক্রিয় ও উত্তেজিত হয়ে ক্রিয়ারত মায়াজমের সাথে মিলিত হয়ে এক বিড়াট জটিলতা সৃষ্টি করে। এ ক্ষেত্রে দ্রুত ক্রিয়ানাশক ঔষধ প্রয়োগ করিতে হইবে ।
সাহায্যকারী (Complementary) ঔষধের সংকেত
(ক) যখন পূর্বের ঔষধে সম্পূর্ণ লক্ষণ অন্তর্হিত হয় না, কিছু কিছু থেকে যায় ।
(খ) প্রথম ঔষধ কাজ করে থেমে যায়, অবশিষ্ট লক্ষণের সাথে আরো নুতন লক্ষণ দেখা দেয় ৷
নূতন ঔষধের সংকেত
(ক) জটিল রোগের ক্ষেত্রে একটা মায়াজমের ক্রিয়া শেষ হয়ে অন্য একটা মায়াজমের লক্ষণ পরিস্কারভাবে ফুটে উঠে, তখন নুতন ঐ মায়াজমের সদৃশ ঔষধ নির্বাচন করিতে হয় । (খ) পূর্ববর্তী ঔষধে অবস্থানরত কষ্ট দূর হয়ে যায় কিন্তু পূর্বের চাপা পড়া অন্য একটা রোগের পুনর্ভাব ঘটে, তখন বর্তমান লক্ষণ সূদশ ঔষধ নির্বাচন করিতে হয় ।
রোগীর পথ্যাদির গুরুত্ব আলোচনা কর:
পথ্য— অসুস্থ্য অবস্থায় রোগীর হজমশক্তির দুর্বল থাকে, রগ্নদেহের জন্য পুষ্টিকর অথচ সহজপাচ্য খাবার নির্বাচন করা হয়, ঐ ধরনের খাবারকে পথ্য বলে । আবার কোন কোন খাদ্য ও পানীয়ের নিজস্ব ঔষধি গুন কোন কোন শক্তিকৃত সূক্ষ্মমাত্রার ঔষধের ক্রিয়া বিনষ্ট করে বা রোগ লক্ষণ বৃদ্ধি করে । ঐ সব খাদ্য কে বর্জন করাও রোগীর জন্য পথ্য । যেমন চা, কফি, কাঁচা পেয়াজ বা রসুন, আফিম, মদ, পান, সিগারেট, অতিরিক্ত অম্লতাপূর্ণ ফল ইত্যাদি । নির্দিষ্ট উদাহরণ হিসাবে বলা যায় –
১। ল্যাকেসিস ও সিপিয়া ব্যবহারের পর টক জাতীয় খাবার খেলে ঔষধের ক্রিয়ার ব্যাঘাত ঘটে.
২। নেট্রাম মিউর প্রয়োগের পর কাঁচা লবণ খেলে ক্রিয়ার ব্যাঘাত ঘটে ।
৩ । মিষ্টি জাতীয় খাবার খেলে জিঙ্কামমেটের পীড়া বৃদ্ধি হয় । তাই হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় পথ্যের ব্যাপারে খুবই সতর্ক থাকা উচিত যাতে পথ্য আরোগ্যের পথে প্রতিকুল না হয়ে অনুকুল হয় ।
ব্যবস্থাপত্র: রোগীর বর্ণনা হতে, রোগীর আত্মীয় স্বজন ও সেবাকারীদের নিকট হতে যে সব রোগ লক্ষণের তথ্য পাওয়া যায় এবং চিকিৎসক নিজে পরীক্ষা করিয়া যে সব লক্ষণ অবগত হন তার ভিত্তিতে যে রোগ লিপি প্রস্তুত হয় তার আলোকে যে সদৃশ ঔষধ নির্বাচিত হয় তা কিভাবে প্রস্তুত হবে, রোগী কিভাবে ঔষধ সেবন করিবে ইত্যাদি লেখা সম্বলিত প্রত্রকে ব্যবস্তাপত্র বলে । ব্যবস্থাপত্রের চারটি অংশ থাকে যথা-
১। সুপারস্ক্রিপশন— এই অংশে রোগীর নাম বয়স ও ঠিকানা লিখা থাকে ।
২। ইনসস্ক্রিপশন— এই অংশে রোগের লক্ষণ, লক্ষণের সদৃশতম ঔষধ, ঔষধের শক্তি ও মাত্রা প্রভৃতি লেখা থাকে ।
৩। সাবস্ক্রিপশন— এই অংশে কম্পাউন্ডারের প্রতি নির্দেশাবলী থাকে যাতে ঔষধের প্রস্তুত প্রণালীর ও বিতরণের নির্দেশাবলী থাকে ।
৪। সিগনেচার- এই অংশে থাকে রোগীর জন্য নির্দেশাবলী । রোগী কখন, কিভাবে ঔষধ খাবে । কতদিন পর আবার দেখা করবে ইত্যাদি। তারপর ডাক্তারের স্বাক্ষর, রেজিঃ নং ও তারিখ থাকে ।
ঔষধ ও খাদ্যের পার্থক্য:
ঔষধ | খাদ্য |
সুস্থ্যদেহে কৃত্রিম রোগ উৎপাদন করিতে পারে এবং প্রাকৃতিক রোগ ধ্বংস করিতে পারে । | দেহের ক্ষয়পুরণ ও পুষ্টি সাধন করে ক্ষুধা মিটায় । |
ফার্মাকোপিয়ার নির্দিষ্ট নিয়মে তৈরি হয় । | প্রকৃতিতে পাওয়া যায় বা রান্না করে তৈরি হয় । |
ঔষধ প্রয়োগে শক্তি ও মাত্রা নির্ধারণ করিতে হয় ৷ | খাদ্য খেতে পুষ্টিমানের দিকে খেয়াল রাখতে হয় । |
একই ঔষধ বিশ্বের যে কোন মানুষের জন্য প্রয়োজন হয় ৷ | বিভিন্ন দেশের খাদ্য বিভিন্ন । |
অসুস্থ্য অবস্থার জন্য ঔষধ প্রয়োজন হয়। | সুস্থ্য ও অসুস্থ্য উভয় অবস্থায় খাদ্যের প্রয়োজন হয় ৷ |
ঔষধ নির্বাচন সঠিক না হইলে চিকিৎসকের কি করা উচিত:
ঔষধ নির্বাচন সঠিক না হইলে এবং ঔষধ জনিত কুফল পরিলক্ষিত হইলে লক্ষণগুলি যদি প্রচন্ড এবং গুরুত্বর না হয় তবে কোন প্রতিষেধক ঔষধ প্রয়োগ না করিয়া রোগীর বর্তমান সকল লক্ষণের সমষ্টির সদৃশ ঔষধ প্রয়োগ করিতে হইবে ।
যদি বর্তমান লক্ষণগুলি প্রচন্ড ও গুরুতর হয় বা রোগীর দেহ কলার বিকৃতি ঘটে বা জীবন সংশয় দেখা দেয় তাহলে প্রয়োগকৃত ঔষধের প্রতিষেধক ব্যবহার করিতে হইবে এবং পরে অবশিষ্ট লক্ষণানুসারে সদৃশ্যবাহী সর্বপেক্ষা উপযোগী ঔষধ ব্যবহার করিতে হইবে ।
যদি বর্তমান লক্ষণগুলি প্রচন্ড ও গুরুতর হয় বা রোগীর দেহ কলার বিকৃতি ঘটে বা জীবন সংশয় দেখা দেয় তাহলে প্রয়োগকৃত ঔষধের প্রতিষেধক ব্যবহার করিতে হইবে এবং পরে অবশিষ্ট লক্ষণানুসারে সদৃশ্যবাহী সর্বপেক্ষা উপযোগী ঔষধ ব্যবহার করিতে হইবে ।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ব্যবস্থাপত্রের গুরুত্ব আলোচনা কর: চিররোগের ক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা যায় সদৃশ ঔষধ প্রয়োগ করার পরও রোগী সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করে না। এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ব্যবস্থাপত্রের প্রয়োজন হয়। যে সব ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ব্যবস্থাপত্রের প্রয়োজন হয় তা নিয়ে আলোচনা করা হল ।
১ । রোগীর প্রাথমিক লক্ষণগুলি ফিরে আসলে ।
২। রোগের কিছুটা উন্নতি হয়ে এক স্থানে দাঁড়িয়ে গেলে ।
৩। পূর্বে চাপা পড়া কোন রোগের পুনঃ’ আগমন ঘটিয়া স্থায়ীভাবে অবস্থান করিলে ।
৪ । জটিল রোগের ক্ষেত্রে- উপরি উক্ত বিষয়গুলি পর্যালোচনা করে পূর্ব ঔষুধের পুনঃপ্রয়োগ, ক্রিয়ানাশক ঔষধের সংকেত, সাহায্যকারী ঔষধের সংকেত, নতুন ঔষধের সংকেত পাওয়া যায় । তাই হোমিও চিকিৎসা দ্বিতীয় ব্যবস্থাপত্রের গুরুত্ব অপরিসীম ।
ব্যবস্থাপনা: দর্শনের আলোকে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার ব্যবস্থাপনা— একজন অসুস্থ মানুষকে তার শারীরিক ও মানসিক কষ্ট থেকে নির্দোষভাবে আরোগ্য করে তার পূর্বের স্বাস্থ্য পুনঃস্থাপন করার লক্ষ্যে হোমিওপ্যাথিক যে সব নীতি, পদ্ধতি, বৈজ্ঞানিক তথ্য, প্রাকৃতিক জ্ঞান ইত্যাদি আছে, তা অনুসরণ করে সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগ করার পদ্ধতিকে হোমিওপ্যাথিক ব্যবস্থাপনা বলে । যেমন ভেষজ চিহ্নিতকরণ ও সংগ্রহ, ভেষজকে শক্তিকৃত করে হোমিও ঔষধে রূপান্তর, ঔষধ প্রুভিং, কেইস টেকিং, ঔষধের শক্তি ও মাত্রা নির্ধারণ, খাদ্য ও পথ্যের নির্দেশনা ইত্যাদি দক্ষতার সাথে ব্যবহার করে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল লাভ করা ৷
দ্বিতীয় ব্যবস্থাপত্র কখন প্রয়োজন হয়:
দ্বিতীয় ব্যবস্থাপত্র প্রয়োজন হয় নিম্নলিখিত চারটি সময়ে-
১ । যখন পূর্বের প্রয়োগকৃত ঔষধটির পুনঃপ্রয়োগের প্রয়োজন হয়— যেমন, (ক) রোগীর প্রাথমিক লক্ষণগুলি ফিরে আসলে । (খ) রোগের কিছুটা উন্নতি হয়ে একস্থানে দাঁড়িয়ে গেলে । ২ । ক্রিয়ানাশক ঔষধের সংকেত পাওয়া গেলে- যেমন,
(ক) রোগীর মধ্যে ছিল না এমন কোন নতুন লক্ষণ দেখা দিলে । (খ) রোগ লক্ষণ অত্যন্ত বৃদ্ধি পেয়ে কমার লক্ষণ দেখা না দিলে । (গ) ঔষধটি বর্তমান ক্রিয়ারত মায়াজমের সদৃশ না হয়ে সুপ্ত মায়াজমের সদৃশ হলে সুপ্ত মায়াজম উত্তেজিত হয়ে ক্রিয়ারত মায়াজমের সাথে একত্রিত হয়ে মারাত্মক জটিলতার সৃষ্টি করিলে ।
৩। সাহায্যকারী (Complementary) ঔষধের সংকেত পাওয়া গেলে— যেমন,
(ক) সবগুলি লক্ষণ চলে না গিয়ে কিছু বাকী থাকিলে ।
(খ) ঔষধ কিছু কাজ করে থেমে গেলে বাকী লক্ষণের সদৃশ ঔষধ
প্রয়োগ করতে হবে ।
৪। নতুন ঔষধের সংকেত পাওয়া গেলে- যেমন,
(ক) ক্রিয়ারত মায়াজমের ক্রিয়া শেষ হয়ে অন্য একটা মায়াজমের পরিষ্কার লক্ষণ ফুটে উঠলে ।
(খ) চাপাপড়া পূর্বের কোন লক্ষণ ফিরে আসলে
আংশিক সদৃশবাহী ঔষধ কখন প্রয়োগ করতে হয়:
যদি চিকিৎসকের অধিক সংখ্যক ঔষধ সম্বন্ধে জ্ঞান না থাকে অথবা রোগটি যদি একদৈশিক হয় অর্থাৎ নির্ভুল সদৃশ ঔষধ নির্বাচনে যদি প্রয়োজনীয় অদ্ভুত, অসাধারণ, পরিচায়ক, আকষর্ণীয়, সুস্পষ্ট, অস্বাভাবিক ইত্যাদি লক্ষণ না থাকে তাহলে আংশিক সদৃশবাহী ঔষধ প্রয়োগ করা হয়
অদৃশ্য শক্তি: যে শক্তি জাগতিক কোন যন্ত্র দ্বারা মাপা মাপা যায় না, অথচ তা অনুভব করা যায়, যাহা দেহের উপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে তাহাই অদৃশ্য শক্তি । জীবনীশক্তি, একটি অদৃশ্যশক্তি। ইহা সুস্থ্য অবস্থায় আমাদের দেহের প্রতিটি অঙ্গ সুশৃঙ্খভাবে নিয়ন্ত্রন করে আবার অসুস্থ্য অবস্থায় দৈহিক ও মানসিক বিকৃতিগুলি বাহিরে প্রকাশ করে
ঔষধের সাহায্য কামনা করে। ফ্রান্সের গণিতবিদ মাউপারটিয়াসের আবিষ্কৃত Law of the least quantity অনুসারে “প্রকৃতির মধ্যে যে কোন পরিবর্তন সাধনের জন্য সামান্যতম ক্রিয়া আবশ্যক” । ঔষধ প্রয়োগে রোগ আরোগ্য হয় । এখানে ঔষধ “সামান্য ক্রিয়া” করে বলেই রোগ আরোগ্য হয় । এই ঔষধের যে শক্তি এটাও একটি অদৃশ্যশক্তি ।
অনুপূরক ঔষধ: একটি নির্দিষ্ট ঔষধ রোগীর উপর কাজ করা সত্ত্বেও যদি সম্পূর্ণ আরোগ্য প্রাপ্তি না ঘটে, তখন অবশিষ্ট উপসর্গ দূর করার জন্য যে ঔষধ ব্যবহার করা হয় তাকে অনুপূরক ঔষধ বলে । যেমন- এলো-সকোট্রিনার পর সালফার প্রয়োগ করিলে সমস্ত উপসর্গ দূর হয়। * এখানে সালফার এলোর অনুপূরক ঔষধ ।
একক মাত্রা: হ্যানিম্যানের অর্গানন অব মেডিসিনের ষষ্ঠ সংস্করণ অনুসারে (৫০ সহস্রতম পদ্ধতির) একই আকৃতির ১০০টি অনুবটিকা যাদের ওজন ১ গ্রেন, এমন একটি অনুবটিকা ঔষধসিক্ত করলে তাহা একক মাত্রা হয় ।
শত্রুভাবাপন্ন ঔষধ: কোন কোন ঔষধের পর কোন কোন ঔষধ ব্যবহার করিলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। যে সব ঔষধ একটির পর অন্যটি খাটেনা বা ক্রিয়ার বৈষম্য ঘটায় তাহাদের একটিকে অন্যটির সত্য ভাবাপন্ন ঔষধ বলে। যেমন- এপিস ও রাসটক্স পরস্পর শত্রুভাবাপন্ন ঔষধ ।
অবদমন (Suppression) প্রচাপন: আদর্শ আরোগ্যের একটি অন্যতম ধারা হল পীড়ার গতি হবে কেন্দ্র হতে পরিধির দিকে । কিন্তু পীড়াটির গতি যদি পরিধি হতে কেন্দ্রের দিকে চালিত হয় তাহাই অবদমন বা চাপা দেওয়া বা প্রচাপন । জীবনীশক্তি যখন রোগশক্তি দ্বারা পরাজিত হয় তখন জীবনীশক্তি রোগটিকে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্ব পূর্ণ অঙ্গে প্রকাশ করে । যেমন চর্মরোগ। চর্মরোগ যদি এন্টিবায়োটিক বা সালফা ড্রাগ্স দ্বারা অপসারিত করা হয় তখন রোগটি ভিতরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে আক্রমণ করে যেমন- ফুসফুসকে আক্রমন করিলে হাঁপানি হয় । এমনকি সদৃশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাতেও অবদমন হতে পারে । যেমন হোমিওপ্যাথিক ঔষধের ক্রিয়া চলাকালে অভিনব কোন লক্ষণ প্রকাশিত হলে আবার অনেক সময় অন্য ঔষধ দ্বারা তাহা অবদমিত করা হয় । ইহার পরিনাম ভাল নয় । ইহা হোমিওপ্যাথিক নীতি পরিপন্থী ।